তাফসীর তরজমানুল কোরআন (সূরা আল ফাতেহা) তাফসীর তরজমানুল কোরআন (১ম খণ্ড)

৳ 500.00

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি ও কংগ্রেস সভাপতি, ভারতের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও শতাব্দীর কালজয়ী মোফাসসের মাওলানা আবুল কালাম আযাদ যখন বৃটিশ ভারতের কোটি কোটি মানুষদের কোরআনের কাছে আনতে চাইলেন, তখন তিনি তার প্রতিভার আয়নায় এ জাতির একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, তাদের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষই কোরআন বুঝে না। কোরআন ‘বুঝার যা কিছু উপকরণ তাদের কাছে ছিলো, তা কোরআনের শাব্দিক অনুবাদের বেড়াজালে এতোটাই আটকে থাকলো যে, কোরআন বুঝার মূল বিষয়টি ওখানে ঢুকতেই পারছিলো না। মাওলানা আযাদ প্রথম ধাক্কাতেই কোরআন অনুধাবনের এই প্রাচীরটাকে ভেংগে ফেলতে চাইলেন। এই প্রাচীর ভাংতে গিয়ে মাওলানা আযাদ নিজেই কোরআনের একটি চমৎকার অনুবাদ উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত করলেন। তার অনুবাদ শিল্পটি এতোই দৃশ্যমান ছিলো যে, একজন পিপাসু পাঠককে কোরআন বুঝার জন্যে বার বার এই অনুবাদের কাছেই ফিরে আসতে হয়। এই অনুবাদ নিয়ে কিছু দূর এগুনোর পরই তিনি টের পেলেন, যে জাতির কাছে তিনি কোরআনের একটি সুন্দর অনুবাদ তুলে দেবেন। তাদের বড়ো একটি অংশ কোরআনের যথার্থ পরিচয়ও জানে না। শত শত বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানরা মাসজিদ মাদরাসা, খানকা ও মাযারের চার দেয়ালের বাইরে কোরআনের কোনো ‘অস্তিত্ব’ কখনোই অনুভব করেনি, বিগত আড়াইশ’ বছরে তারা এ দেশে কোরআনের অন্য কোনো ভূমিকাও দেখেনি। এখানকার মানুষদের ব্যক্তি, পরিবার, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সর্বত্রই কোরআন ছিলো মর্মান্তিকভাবে অবহেলিত ও নিদারুণভাবে উপেক্ষিত। মাওলানা আযাদের মতো মুসলিম মিল্লাতের কোরআনের সাধকরা যখন এই উপেক্ষিত বস্তুকে পুনরায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালকের চেয়ারে বসাতে চাইলেন, তখন তারা সবার আগে সমাজ ও সমাজ ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকল মানুষদের কাছে কোরআনের সঠিক পরিচয়টা তুলে ধরতে চাইলেন।

কালের শ্রেষ্ঠ মোফাসসের আবুল কালাম আযাদের ঐতিহাসিক ‘তাফসীর তরজমানুল কোরআন’ এ পথেরই এক বলিষ্ঠ মাইলফলক।

মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও তার বিষ্ময়কর তাফসীর ভাবনা

তরজমানুল কোরআন

‘তরজমান’- সুন্দর একটি আরবী শব্দ- বাংলায় আমরা যাকে বলি ‘মুখপাত্র’। সে হিসেবে ‘তরজমানুল কোরআন’ মানে ‘কোরআনের মুখপাত্র’। জানি না কোন্ ঐতিহাসিক পঠভূমিকায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তার কোরআন সাধনার জন্যে এই নামটি বাছাই করেছেন, তবে ভারতীয় মুসলমানদের পরবর্তী অর্ধ শতাব্দীর কোরআন সাধনার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের সামনে দিবালোকের ন্যায় এ কথাটি বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মাওলানা আযাদের তাফসীরটি আসলেই কোরআনের একটি জীবন্ত ‘মুখপাত্র’।

কোরআনুল কারীমের এই জীবন্ত মুখপাত্র- তরজমানুল কোরআনের ভেতর বাইরের কিছু কথা মাওলানা আযাদ নিজেই এই গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন। এই তাফসীরের বাংলা অনুবাদ গ্রন্থের শুরুর দিকে বিজ্ঞ পাঠকদের জন্যে আমরা সেই ভূমিকার হুবহু অনুবাদ পেশ করেছি। মূল গ্রন্থের গভীরে অবগাহন করার আগে আমরা পাঠকদের অনুরোধ করবো, মনোযোগ দিয়ে সে কথাগুলো একবার পড়–ন। এই ভূমিকায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদ কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর ভাবনার কথা তার মেধানিসৃত কলম দ্বারা নিজেই ব্যক্ত করেছেন। ভারতীয় মুসলমানদের কোরআনের সান্বিদ্ধে আনার জন্যে তিনি যখন তার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেন, তখন প্রথমেই তিনি একটি বড়ো রকমের ধাক্কা খেলেন। এই ধাক্কাটি এতোই প্রচ- ছিলো যে, পুনরায় তাকে কোরআন নিয়ে দাঁড়াতে প্রায় অর্ধশত বছর সময় চলে গেলো।

মাওলানা আযাদ যখন বৃটিশ ভারতের কোটি কোটি মানুষদের কোরআনের কাছে আনতে চাইলেন, তখন তিনি তার প্রতিভার আয়নায় এ জাতির একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পেয়েছিলেন। যাদের তিনি কোরআনের কাছে আনতে চাইলেন, তিনি দেখলেন, তাদের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষই কোরআন বুঝে না। কোরআনকে তাদের ভাষায় বুঝানোর জন্যে তখন যথেষ্ট উপায় উপকরণও সমাজে মজুদ ছিলো না। কোরআন বুঝার যা কিছু উপকরণ হাতের কাছে ছিলো, তা কোরআনের শাব্দিক অনুবাদের বেড়াজালে এতোটাই আটকে থাকলো যে, কোরআন বুঝার মূল বিষয়টি ওখানে ঢুকতেই পারছিলো না। মাওলানা আযাদ প্রথম ধাক্কাতেই কোরআন অনুধাবনের এই প্রাচীরটাকে ভেংগে ফেলতে চাইলেন। কিছু দূর এগুনোর পর তিনি টের পেলেন, যে জাতির কাছে তিনি কোরআনের একটি সুন্দর অনুবাদ তুলে দেবেন তাদের বড়ো একটি অংশ কোরআনের যথার্থ পরিচয়ও জানে না। শত শত বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানরা মাসজিদ মাদরাসা, খানকা ও মাযারের চার দেয়ালের বাইরে কোরআনের কোনো ‘অস্তিত্ব’ অনুভব করেনি, বিগত আড়াইশ’ বছরে তারা এ দেশে কোরআনের অন্য কোনো ভূমিকা দেখেনি। এখানকার মানুষদের ব্যক্তি পরিবার, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিম-লের সর্বত্রই কোরআন ছিলো মর্মান্তিকভাবে অবহেলিত ও নিদারুণভাবে উপেক্ষিত। মাওলানা আযাদের মতো মুসলিম মিল্লাতের কোরআনের সাধকরা যখন এই উপেক্ষিত বস্তুকে পুনরায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালকের চেয়ারে বসাতে চাইলেন, তখন তারা সবার আগে সমাজ ও এ সমাজ ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকল মানুষদের কাছে কোরআনের সঠিক পরিচয়টা বুঝাতে এগিয়ে এলেন।

ভারতীয় মুসলমানদের সাথে কোরআনের পরিচয় করানোর এই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তাদের হাতে কোরআনের একটি সহজ ও সুন্দর অনুবাদ তুলে দেয়ার মহান ব্রত নিয়েই মনীষী চিন্তাবিদ আবুল কালাম আযাদ সর্বপ্রথম ‘আল হেলাল’ ও ‘আল বালাগ’ নামক দু’টি মননশীল গবেষণা পত্রিকা বের করেন। এই দু’টি পত্রিকা দীর্ঘ ২ যুগ ধরে কোরআনের জ্ঞান বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষদের পুনরায় কোরআনের সুশীতল ছায়ার নীচে আশ্রয় দিতে চেয়েছে, কিন্তু কোরআনের দেশী বিদেশী দুশমনরা তাকে এর কোনো কাজই ঠিকমতো করতে দেয়নি। কোরআন সাধনার এক বৃহৎ অংশই তাকে কারার অন্তরালে কাটাতে হয়েছে। অনেকগুলো বছর তিনি শুধু দেশের এক জেল থেকে আরেক জেলে স্থানান্তরিত হয়েছেন। ছোটো ছোটো জেলের বাইরে ছিলো আরো বড়ো জেল- যাকে বলা হয় ‘নযরবন্দী জীবন যাপন’। ঘরের একটি নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে তার যাওয়ার অনুমতি নেই, কারো সাথে দেখা করার অনুমতি নেই, কারো সাথে কথা বলার স্বাধীনতা নেই। দু’ যুগ ধরে চলা এ অব্যাহত মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নেও যখন তার কোরআন সাধনাকে দমানো গেলো না, তখন প্রচ- এক থাবা এলো তার জ্ঞান সাধনার উপায় উপকরণগুলোর ওপর। প্রতিবারই দেখা যায় নিজের জ্ঞান গবেষণা ও পড়ালেখার কাজ যতোটুকু তিনি করেন, বৃটিশ গোয়েন্দারা ‘কন্টেন্ট চেক’ করার কথা বলে তা তুলে নিয়ে যায়। মাসকে মাস চেষ্টা করেও গোয়েন্দাদের লোহার সিন্দুক থেকে সে মূল্যবান গবেষণা সম্পদগুলো বের করে আনা যায় না, অনেক চেষ্টার পর যদি কোথায়ও থেকে সৌভাগ্যক্রমে কিছু উদ্ধার করা যায়- তার করুণ অবস্থা দেখে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কোনোই উপায় থাকে না।

বহুবারই এই অবস্থার নির্মম শিকার হয়েছেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ নিজে। এর কিছু কিছু কাহিনী তিনি তার তাফসীরের ভূমিকায় বলেছেন। আবার গোয়েন্দাশাখার অন্ধকার কক্ষে দীর্ঘদিন অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকার পর অধিকাংশ পান্ডুলিপিই দেখা যেতো- এমনভাবে তা বিনষ্ট হয়ে গেছে যে, তাকে নতুন করে লেখা ছাড়া কোনো উপায়ই থাকতো না। শত কাজে ব্যস্ত থাকা ভারতের সবচাইতে বড়ো দলের একজন শীর্ষমানের নেতা হওয়ার সময়মতো সব পা-ুলিপির মেরামত ও পুনর্লিখন তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠতো না, ফলে তরজমানুল কোরআনের গবেষণা, পা-ুলিপি প্রণয়ন ও কর্ম সম্পাদনে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশী সময় চলে যেতো। এতো অত্যাচার এতো যুলুম এতো বিড়ম্বনা না থাকলে এই মহান তাফসীরটি হয়তো অনেক আগেই পাঠকদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হতো। আসলে আল্লাহর এ যমীনে মানুষের কোন্ কাজটি কোন্ সময় সম্পন্ন হবে- তা একমাত্র তিনিই জানেন।

কোনো গবেষক যখন সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন তার গবেষণাকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যহত হবে এটাই স্বাভাবিক। মাওলানা আযাদের জন্যে বিষয়টি ছিলো আরো জটিল, আরো স্পর্শ কাতর, কারণ তিনি যে শুধু সক্রিয় রাজনীতিতেই জড়িয়ে পড়েননি- তিনি ছিলেন ভারতের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের একজন শীর্ষ নেতা। ওই সময়টা ছিলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের শেষ অধ্যায়। দীর্ঘ দিন থেকে ভারতীয়রা বিশেষ করে এখানকার আলেম ওলামা ও মুসলিম নেতারা যেভাবে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকে বিজয়ের একান্ত কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন- তাতে আন্দোলনের রূপরেখা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে মাওলানা আযাদের ভূমিকা ছিলো অনেকটা মুখ্য চরিত্রের মতো। এ অবস্থায় ভারতভূমির স্বাধীনতা সংগ্রাম- ভোট নির্বাচন, হরতাল অবরোধ, মিছিল সমাবেশ, বক্তৃতা বিবৃতির তুমুল হট্টগোলের মাঝেও ‘তরজমানুল কোরআন’-এর মতো একটি বড়ো মাপের তাফসীর লেখার যে দু:সহ কাজটি তিনি শুরু করেছেন, তাকে পুরোপুরি নিজের মতো করতে না পারলেও- এই অমূল্য তাফসীরটি এক সময় তিনি সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর নযীর ইতিহাসে আসলেই বিরল। আল্লাহ তায়ালা মাওলানা আযাদকে কেয়ামতের মহা বিচারের দিনে যাবতীয় দুঃখ কষ্ট থেকে ‘আযাদ’ করে দিন!

আসলে কোনো গবেষণা কর্ম বিশেষ করে কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর লেখার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি রাজনৈতিক শোরগোলের সাথে এক সাথে সম্পন্ন করা যে কতো মুশকিল তা শুধু তারাই জানেন- যাদের এ কাজের কিছু প্রাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা নিজের কিংবা অন্যের জীবনে দেখার সুযোগ হয়েছে!

ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেক অগ্রজ নায়ক ছিলেন মাওলানা আকরাম খান। বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম ‘হোম গ্রোন’ তাফসীরের তিনি ছিলেন বিদগ্ধ রচয়িতা, তার জীবনেরও এক অংশ কেটেছে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম সংগঠিত করার পেছনে। তিনি ছিলেন উভয় বাংলায় মুসলিম সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জনক। আন্দোলন সংগ্রামে ব্যস্ত থাকার সময় তিনিও কোরআনের একটি মূল্যবান তাফসীর লিখেছেন। তাও তার ভাষায়- তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে করতে পারেননি।

তাফসীর গবেষণার আরেক মহান ব্যক্তি মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। অন্যদের মতো তিনি যে শুধু রাজনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়েছেন তাই নয়- তিনি ভারতীয় মুসলমানদের জন্যে একটি স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি ও সে রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্যে স্বতন্ত্র একটি দলও গঠন করেছেন। দল গঠন করার মাত্র ৬ বছরের মাথায় ভারত ও পাকিস্তান নামের নতুন দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। ভারত ভূমির এই ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ভাংগাগড়ায় তাকে তার জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান সময়গুলোই ব্যয় করতে হয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত দলের পেছনে। প্রায় একই সময়ে তিনিও কোরআনের একটি তাফসীর লিখতে শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, দল ও দলীয় রাজনৈতিক কর্মকা-ে তার সময়গুলো যদি ব্যয়িত না হতো তাহলে এ ঐতিহাসিক তাফসীরের পূর্ণতার জন্যে জাতিকে ৩০ বছর অপেক্ষা করতে হতো না।

ভারতের আরেক কোরআনের প-িত মাওলানা মাহমুদুল হাসান- তিনিও জেল যুলুম অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের মাঝে বসেই কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর লিখেছেন। মিশরের সাইয়েদ কুতুব শহীদের ব্যাপারটা ছিলো কিছুটা ভিন্ন, তিনি যখন তাফসীর লিখতে শুরু করেন, তখন সেখানে অলরেডী একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল কাজ করছিলো, তাই তাকে ওই দলের প্রাথমিক কাজকর্ম করতে হয়নি। তিনি শুধু শহীদ হাসানুল বান্নার প্রতিষ্ঠিত ‘ইখওয়ানুল মোসেলমূন’-এ যোগ দিয়েছেন, এরপর তিনি তার বেশীর ভাগ সময় কোরআনের তাফসীরেই ব্যয় করেছেন- জেল যুলুম শারীরিক মানসিক নির্যাতন ও ফাঁসির রশি সবকিছুর সাথে লড়াই করেও ১০ বছরের মধ্যে তিনি তার কালজয়ী তাফসীরটি সম্পন্ন করেছেন।

তরজমানুল কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদের সম্মানিত পাঠকদের এসব ইতিহাস আজ আমি শোনাতে চাইনি। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক পরিবেশে বসেও এই কোরআন সাধকরা কিভাবে কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর লেখার মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন তা লেখার জন্যে আমার এই কয়েক পৃষ্ঠার ভূমিকা মোটেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ইতিহাসের পাতা থেকে এই বিচ্ছিন্ন মণি মুক্তাগুলোকে কুড়িয়ে এক জায়গায় জড়ো করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে তাদের কোরআন সাধনার এই উপাদানগুলোকে এক ছাদের নীচে জড়ো করে রাখা। আমি জানি, সময়ের এই দাবী পূরণে কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো গবেষক এগিয়ে আসবেন।

আমি বিশ্বাস করি, কোরআন গবেষকদের গবেষণা কর্ম ও তাদের দলীয় রাজনীতির মাঝে একটা সমন্বয় সাধন করা অত্যন্ত জরুরী। আমি জানি, যে যমীনে বসে আপনি কোরআন সাধনা করবেন, কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর করবেন, সে যমীনের রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকা- থেকে আপনি আপনাকে কোনোমতেই বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন না। এর আরেকটি বড়ো কারণ হচ্ছে, কোরআন তো আসলে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মতো কোনো ‘থিউরীর বই’ নয়- এটা হচ্ছে একটি ‘প্রাকটিক্যাল গ্রন্থ’। কোরআন সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে আপনি যে নতুন সমাজ গড়তে চান- তার একটি অবিচ্ছিন্ন বিষয় হচ্ছে, সে সমাজের সমকালীন রাজনীতি। এই কারণেই একজন কোরআন গবেষক শুধু গবেষণা কর্মের অজুহাতেই রাজনীতি বিমূখ হতে পারেন না। এর সব কথাই আমি জানি, এর প্রাসংগিকতাও আমি বুঝি, তারপরও যারা মেধা ও মনন দিয়ে এই দেশের জ্ঞান গবেষণা কার্য পরিচালনা করেন, তাদের এই বিষয়টার স্পর্শকাতরতা বুঝে ‘কোরআনিক স্পেশালাইজেশানের’ কথাটি চিন্তা করতে হবে এবং এই দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাবের কথা ভেবে গবেষণা কর্ম ও মাঠের রাজনীতির মাঝে একটা সমন্বয় সাধন করা দরকার। মেডিক্যাল কলেজে সবাই ডাক্তার হন- কিন্তু আলাদাভাবে সাবজেক্টওয়াইজ স্পেশালিষ্ট তৈরী না হলে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থাই এক সময় ঝুকির মধ্যে পড়ে যাবে।

মাওলানা আযাদের সমগ্র তাফসীরে কোরআনের এই চমৎকার অনুবাদ শিল্পটি এতোই দৃশ্যমান যে, একজন পিপাসু পাঠককে কোরআন বুঝার জন্যে বার বার এই অনুবাদের কাছেই ফিরে আসতে হয়, তার অনুবাদকর্মটি উর্দূ সাহিত্যে এতোই উঁচু মানের যে, অন্য কোনো ভাষায় হুবহু এর অনুবাদ অনেকটাই দুসাধ্য, কিছুটা ঝুকিপূর্ণও বটে। আমরাও প্রতিনিয়ত এই ঝুকির মধ্যে ছিলাম।

আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স-এর ব্যানারে ইতিপূর্বে আমরা যে কয়টি তাফসীর বের করেছি তার দুটোই ছিলো আরবী থেকে, আর আরবী তাফসীরে স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের কোনো আলাদা অনুবাদের দরকার হয়নি। এ দু’টো তাফসীরের বাংলা অনুবাদে আমরা আমাদের প্রকাশিত কোরআনের সহজ সরল অনুবাদটি ব্যবহার করেছি। এরপর আমরা একটি উর্দূ তাফসীর বাংলায় অনুবাদ করেছি। সে তাফসীরে ব্যবহৃত অনুবাদ শাব্দিক অনুবাদ হওয়ায় সে অনুবাদটিকে পুনরায় আমরা বাংলায় করতে চাইনি। কোরআন বুঝানোর স্বার্থেই সেখানেও আমরা পরিকল্পনা থেকে ফিরে এসে আমাদের সহজ সরল অনুবাদটি ব্যবহার করেছি।

এখন আমাদের যে তাফসীরটির বাংলা অনুবাদ আপনার হাতে শোভা পাচ্ছে- তাও একটি উর্দূ তাফসীর-এর অনুবাদ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এর অনুপম অনুবাদ কর্মটি। এটা আমি ইতিপূর্বেই আপনাদের বলেছি। কোরআন বুঝার স্বার্থে এই তাফসীরেও আমরা শুরুর দিকে আমাদের সহজ সরল অনুবাদটি ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দু’টি কারণে আমরা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মূল অনুবাদটির সরাসরি বাংলা অনুবাদটাই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত করি। এই সিদ্ধান্তের কিছু পার্শ্বঝুকির ব্যাপারে আমি মোটেই অসচেতন নই। আমি ইতিপূর্বেও একাধিকবার একথা বলেছি, কোরআনের অনুবাদ সবসময়ই তৃতীয় কোনো ভাষা থেকে না করে সরাসরি কোরআনের ভাষা থেকেই করতে হয়। যারাই কোরআনের কোনো একটি অনুবাদকে আরেক ভাষায় অনুবাদ করতে চেয়েছেন, তারা কেউই এ ঝুকি থেকে মুক্ত নন। এর আগেও বাংলাদেশে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এ কাজটি করেছেন- তাদের কয়েকজনের সাথেই আমি সরাসরি কথা বলেছি, আমি আশা করি, সবাই স্ব স্ব জায়গায় সতর্ক হয়ে পা ফেলবেন।

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে তরজমানুল কোরআনের যে খ-টি এখন আপনার হাতে আছে, তা ৭ আয়াত বিশিষ্ট কোরআনের একটি ছোট্ট সূরা- সূরা আল ফাতেহা -‘উম্মুল কোরআন’। এখানে আয়াত সংখ্যা মাত্র ৭টি হওয়ায় পার্শ্বঝুকির আশংকাও তুলনামূলকভাবে কম। পরবর্তী খ-গুলোতে যেহেতু আয়াতের পরিমাণ বেশী তাই মানুষ হিসেবে সেখানে যতোটুকু সতর্ককা অবলম্বন করা দরকার- ততোটুকু সতর্কতা অবলম্বনে আমরা কখনো অবহেলা করবো না- এটুকুই আমি আপনাদের বলতে পারি। শতভাগ সতর্কতার পরও যদি মানবীয় দুর্বলতার কারণে কোথায়ও ছোটোখাটো ভ্রান্তি থেকে যায়, তাহলে বিনয়ের সাথে আল্লাহর দরবারে আমরা ক্ষমার মিনতি জানাবো।

মোফাসসেরে কোরআন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তার এই ঐতিহাসিক সাধনা কর্মের প্রথম খ-ের নাম দিয়েছেন ‘উম্মুল কোরআন’। উম্মুল কোরআন সূরা আল ফাতেহারই আরেক নাম। যার ওপর আল্লাহ তায়ালা কোরআন নাযিল করেছেন সূরা ফাতেহার এই নামকরণ তিনি নিজেই করেছেন। এ সূরার আরো যে কয়টি নাম আছে, তার মধ্যে অর্থ ও ভাবের দিক থেকে এই নামটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। উম্মুল কোরআন -কোরআনের নির্যাস, কোরআনের মূলমন্ত্র! আসলেই সূরা আল ফাতেহা হচ্ছে সমগ্র কোরআনের মূল, আবার এই সূরা হচ্ছে ফাতেহাতুল কিতাব -কোরআনের ভূমিকা। আল্লাহ তায়ালা সমগ্র কোরআনের ম্যাসেজকেই বলতে গেলে এই ছোটো সূরাটিতে নির্যাসের আকারে বসিয়ে দিয়েছেন। এ কারণেই বলা হয় এটা হচ্ছে কোরআনের মূল।

‘উম্মুল কোরআন’ তথা কোরআনের নির্যাস নামে ‘তরজমানুল কোরআন’-এর প্রথম খ-টি প্রকাশের পর দ্রুত সময়েই এই মহান তাফসীরের বাকী খ-গুলো পাঠকদের হাতে তুলে দেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেই আজকের মতো কোরআনের এই বরকতময় মাহফিল থেকে আমি বিদায় নিচ্ছি।

 

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স

লন্ডন

জানুয়ারী ২০২৫

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৫৫

সাইজ: ৬.২ × ৯.৪ ইঞ্চি

কভার: হার্ড কভার

প্রিন্ট: সাদা কালো

কাগজ: ৬১ গ্রাম অফ হোওয়াইট

ওজন: ০.৭ কেজি

অর্ডার করার পর সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে ডেলিভারি প্রদান করা হয়।

ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা। (অফিস ডেলিভারি ও হোম ডেলিভারি দু’ব্যবস্থাই রয়েছে)

শর্তাবলি:

যদি কোনো পৃষ্ঠা ছেড়া ফাটা থাকে

ফর্মা মিসিং হয়

কভার উল্টা অথবা ছেড়া হয়

এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্সচেঞ্জ দিয়ে থাকি।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “তাফসীর তরজমানুল কোরআন (সূরা আল ফাতেহা) তাফসীর তরজমানুল কোরআন (১ম খণ্ড)”

Your email address will not be published. Required fields are marked *