| কোরআনুল কারীমের
সূরাভিত্তিক শানে নুযূল
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
যমিনের বাসিন্দাদের জন্যে আরশের মালিকের এক অমূল্য তোহফা হচ্ছে ‘কোরআনুল কারীম’। এই কোরআনুল কারীমের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সূরার ৩টি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। সূরা আল বাকারা, সুরা আন নেসা ও সূরা আল মায়েদা- ক্রমিক নাম্বারে প্রথম দু’টো সূরার মাঝখানে একটি সূরার গ্যাপ। পরের দু’টো সূরার মাঝখানে একটা সূরা বাদ দিলে কোরআনের পাতায় এই সূরাগুলোর অবস্থান একান্ত পাশাপাশি। একটি অভিন্ন বিষয়কে কোরআন মাজীদ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে আমাদের কাছে পেশ করেছে। এই বিষয়টি হচ্ছে ‘মদ সংক্রান্ত আল্লাহ তায়ালার বিধান’। সূরা আল বাকারার আয়াতটি হচ্ছে, ‘হে নবী, লোকেরা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে- তুমি বলো, এ দু’টোর মধ্যে রয়েছে বড়ো গুনাহ, তবে এতে মানুষের (সাময়িক) কিছু ফায়দাও আছে’ (আয়াত ২১৯)। এর বেশ কিছুদিন পর চতুর্থ হিজরীতে সূরা আন নেসার এই আয়াতটি নাযিল হলো- ‘নেশাগ্রস্থ অবস্থায় তোমরা নামাযের ধারে কাছেও যেও না’ (আয়াত ৪৩)। কিছুদিন পর এ বিষয়ের সর্বশেষ আয়াতটি নাযিল হলো- ‘মদ, জুয়া, পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়কারী শর- এগুলো হচ্ছে শয়তানের গর্হিত কাজ, তোমরা এগুলো সম্পূর্ণরূপে বর্জন করো’ (সূরা আল আনয়াম, আয়াত ৯০)।
সূরা আন নেসার ৯০ নং আয়াতটি যখন নাযিল হয়, তখন বিশিষ্ট কোরআন সাধক হযরত বারা বিন আযেব প্রিয়নবীর সামনে মজুদ ছিলেন। সহীহ বোখারীতে তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ আয়াতটির বাংলা অর্থ হচ্ছে- ‘মোমেনদের মাঝে যারা ঘরে বসে থেকেছে, আর যারা নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদে অবতীর্ণ হয়েছে এরা কখনো এক নয়’। তিনি বলেছেন, জেহাদের এই আয়াতটি যখন নাযিল হচ্ছিলো তখন প্রিয়নবী বলেন, তোমরা যায়েদকে ডাকো, তাকে বলো- দোয়াত কলম নিয়ে আসতে। যায়েদ এলে তিনি তাকে সদ্য নাযিল হওয়া এই আয়াতটি লিখতে বললেন। এ সময় অন্ধ সাহাবী হযরত আমর বিন উম্মে মাকতুম পেছন থেকে বললেন, ইয়া রসূলুল্লাহ আমি অন্ধ মানুষ, আমার তো জেহাদের জন্যে ঘরের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা নেই, আমার জন্যে আল্লাহর কি আদেশ? আল্লাহ তায়ালা সাথে সাথেই ‘গায়রা উলিদ্ দরারি’ অর্থাৎ ‘কোনো রকম অক্ষমতার কথা বাদে’ বাক্যাংশটি যোগ করে আয়াতটি পূণরায় নাযিল করলেন। নতুন অংশটি সহই এ আয়াতটি কোরআনের পাতায় লেখা আছে। সম্মানিত পাঠকদের জন্যে আমি এখানে কোরআনুল কারীম থেকে মাত্র দু’টি উদাহরণ পেশ করলাম। প্রথম উদাহরণে আমি মদ নিয়ে কোরআনের ৩টি সূরার ৩টি আয়াত উল্লেখ করেছি। একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মদ পান অবশ্যই বড়ো একটি গুনাহ, যদিও এর কিছু কিছু ফায়দাও আছে’। পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা (মদ খেয়ে) নেশাগ্রস্থ হয়ে নামাযের কাছে যেওনা’। সর্বশেষে বলা হয়েছে, ‘মদ হচ্ছে শয়তানের একটি গর্হিত কাজ, তোমরা তা সম্পূর্ণ বর্জন করো’। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ ৩টি আয়াতের মধ্যে যে পারস্পরিক অসংগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি তার একমাত্র কারণ হচ্ছে এ ৩টি আয়াত- যে ৩টি আলাদা সময়ে আলাদা পরিস্থিতিতে আলাদা ঐতিহাসিক পটভূমিকায় নাযিল হয়েছে সেগুলো আমাদের দৃষ্টির সামনে নেই। যদি কোরআনের পাতায় স্বতন্ত্র টীকা দিয়ে আয়াতগুলো নাযিলের সময়কালীন পটভূমিকাটা তুলে ধরা হতো, তাহলে আমাদের কারো কাছেই এ আয়াতগুলোর বিধানে কোনো অসংগতি নযরে পড়তো না। মদ সংক্রান্ত এ ৩টি আয়াতে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা ও এক আয়াতের সাথে আরেক আয়াতের সম্পৃক্ততা বুঝানোর জন্যে কোরআন অধ্যয়নকারীদের সমসাময়িক বিষয়গুলোর ঐতিহাসিক পটভূমিকাটা ভালো করে জানতে হবে। সংক্ষেপে সে ঐতিহাসিক পটভূমিকা হচ্ছে, আল্লাহর নবী যখন মদীনায় গেলেন তখন তিনি সেখানে স্থানীয় লোকদের মাঝে এ মদের প্রচলন দেখলেন। লোকেরা তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদের যে জবাব দিয়েছেন তাই এখানে প্রথম আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী লোকেরা বুঝতে পারলো, কিছু কিছু ফায়দা থাকলেও আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূল এটা মনে হয় পছন্দ করেন না। সাহাবাদের মধ্যে- বিশেষ করে হযরত ওমর বললেন, হে আল্লাহ! তুমি মদের বিষয়টি আমাদের আরো খোলাখুলি বলে দাও। অতপর এর ব্যবহার আরো সীমিত করার জন্যে ৪র্থ হিজরীতে দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল হলো। এবার মানুষরা বুঝে নিলো আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নবী এ মদের সংস্কৃতি মোটেই পছন্দ করেন না। হযরত ওমর আবারও আল্লাহ তায়ালার দরবারে আরযী জানালেন। সবাই বুঝতে পারলো, অচিরেই বিষয়টির একটি চূড়ান্ত সুরাহা হতে যাচ্ছে। অবশেষে নাযিল হলো মদ সম্পর্কিত আল্লাহ তায়ালার চূড়ান্ত আদেশ। এ তৃতীয় আয়াতের শেষের দিকে এসে যখন আল্লাহ তায়ালা কোরআনের সাথীদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাহাল আনতুম মুনতাহুন’? তোমরা কি এ থেকে ফিরে আসবে না? হযরত ওমর সাথে সাথে বলে উঠলেন, ‘ইনতাহাইনা’ ‘ইনতাহাইনা’ আমরা বিরত হলাম, আমরা নিবৃত হলাম, অর্থাৎ আমরা পুরোপুরিই মদ ছেড়ে দিলাম। প্রাচীন আরবদের মাঝে মদ সংস্কৃতির ভিত্তিমূল যে কতো মজবুত ছিলো এটা আমরা জাহেলিয়াত যুগের গল্প কবিতা ও গান থেকেই বুঝতে পারি। মদ নির্ভর একটি সমাজ মদ দূরীভূত করার জন্যে হঠাৎ করে যদি কোনো রাষ্ট্রীয় অর্ডিন্যান্স জারি করা হতো, তা হলে তা মোটেই কার্যকর হতো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন। বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও তাদের সমাজ থেকে মদ উচ্ছেদ করতে পারেনি। অপর দিকে। মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজদেহ থেকে মদমদ্যতা দূর করার জন্যে কোরআনের এ ৩টি পর্যায়ক্রমিক সংশোধন কর্মসূচী কতোটুকু সফল ও কার্যকরী হয়েছে তা আমরা সাহাবাদের ইতিহাসেই দেখতে পেয়েছি। সাহাবায়ে কেরামদের ইতিহাসে বিশেষ করে হযরত আলী, হযরত আবু হোরায়রা, হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ, হযরত হাতেম ও হযরত বারা বিন আযেব-সহ আরো কয়েকজন হাদীস বর্ণনাকারীর বর্ণনায় হাদীসের কিতাবসমূহে এ নিয়ে আরো অনেক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। আমি তো এখানে বিষয়টির প্রতি সামান্য একটু ইংগিত দিলাম মাত্র! এই আয়াতগুলোর ঐতিহাসিক পটভূমিকা অর্থাৎ যে বিশেষ কারণে কোরআনের ৩টি আয়াত সম্পূর্ণ ৩টি ভিন্ন পরিবেশে নাযিল হয়েছে তা জানা কতো বেশী জরুরী তা আমরা এই বইটির ভূমিকায় দেখতে পেয়েছি। এটা না জানলে আমরা কোরআন থেকে কিছুতেই সঠিক পথের দিশা লাভ করতে পারবো না। এবার জেহাদের বিধান সংক্রান্ত আয়াতটির প্রতিও একবার লক্ষ্য করুন। আয়াতটি নাযিল হবার সময় যদি অন্ধ সাহাবী হযরত আমর বিন উম্মে মাকতুম সেখানে মজুদ না থাকতেন তাহলে শারীরিক দিক থেকে অক্ষমতা থাকুক আর না থাকুক- সবার জন্যেই ময়দানের জেহাদে অংশগ্রহণ করা জরুরী হতো।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঠিক একথাটাই আমাদের বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘কোরআন যখন নাযিল হয় তখন যদি তোমরা কোনো প্রশ্ন করো তাহলে তোমাদের জন্যে (সে উত্তর) প্রকাশ করা হবে’। (সূরা আল মায়েদা, আয়াত ১০) বিশ্বস্ত সূত্র মোতাবেক ৬১০ সালে রমযানুল মোবারক মাসের ২১ তারিখ সোমবার রাতে কোরআন নাযিল শুরু হয়। কোরআন নাযিলের এ সময়ের মোট ১২ বছর ৫ মাস ১৩ দিন তিনি মক্কায় ও ৯ বছর ৯ মাস ৯দিন মদীনায় কাটিয়েছেন। সর্বমোট ২২ বছর ২ মাস ২২ দিন পর (৬৩২ সালের ৮ জুন) ১১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার রাতে কোরআনের সর্বশেষ আয়াতটি নাযিল হয়। প্রিয়নবী এরপর ৯ দিন মাত্র জীবিত ছিলেন। এ পুরো সময়ে যাদের সামনে প্রতিনিয়ত কোরআনের আয়াতগুলো নাযিল হচ্ছিলো-আল্লাহ তায়ালা যাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ ও গোটা জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন ও অসংখ্য সমস্যার সমাধান এই কোরআনের পাতায়ই পেশ করছিলেন- তারা অবশ্যই মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কারণ তাদের নানা প্রয়োজন, নানা চাহিদা ও নানা প্রত্যাশার কথা কোরআনে স্থান পেয়েছে। এমনও দেখা গেছে যে, কোরআনের কোনো আয়াত যখন নাযিল হচ্ছিলো তখন কোরআনিক জেনারেশানের কারো কারো মনে কোনো প্রশ্ন কিংবা দ্বিধা দেখা দিলো, আল্লাহ তায়ালা তা শুনলেন এবং যেহেতু তখনো কোরআনের আয়াত নাযিল হচ্ছিলো- আল্লাহ তায়ালা সময়ের প্রয়োজনে তা বদলে দিলেন। তাদের সামনেই নতুন সংযোজন কিংবা বিয়োজনসহ কোরআনের নতুন আয়াত নাযিল হলো। জেহাদের আয়াতের উদাহরণ আমি ইতিপূর্বেই দিয়েছি। প্রিয়নবী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ দয়া ও কোমলতার কারণে বদরের বন্দিদের মুক্তিপণ নিয়ে। ছেড়ে দিলেন। হযরত ওমর এই বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই বান্দাহর মনের উদ্বেগেরও জবাব দিলেন (সূরা আল আনফাল, ৬৭-৬৮)। কোরআনে এ ধরণের আয়াত আরো আছে। এখানে সব উদাহরণ পেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম যে, কোরআনের অনেকগুলো আয়াতের সাথেই আয়াত নাযিলের পটভূমিকা অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও যে বিশেষ ঘটনার কারণে আয়াতটি নাযিল হয়েছে তার একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব আয়াতের সঠিক অর্থ বোঝার জন্যে সকল কোরআন পাঠকদের দেড় হাজার বছর আগের সে আয়াতটি নাযিলের পরিবেশে ফিরে যেতে হবে। কিছুটা সময় যদি আমরা দেড় হাজার বছর আগের মক্কা, মদীনা, তায়েফ, বদর, ওহুদ, তবুক ও হোনায়নের আশে পাশে কোরআনের সাথীদের সাথে কাটিয়ে আসতে পারি, তাহলে কোরআন নিজেই আমাদের তার নুযুলের রহস্য বলে দেবে। হাঁ, এ বিষয়টিকেই কোরআন ব্যাখ্যাতাদের পরিভাষায় বলা হয় ‘আসবাবুন নুযুল’। উমাইয়া খেলাফতের সময়েই মনীষী কোরআন সাধকরা ‘আসবাবুন নুযুল’ নিয়ে বই পুস্তক লিখতে শুরু করেন, উমাইয়া যুগের এসব অধিকাংশ লেখাই ছিলো তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত কোরআনের অংশ বিশেষের আলোচনা। আব্বাসীয় যুগে এসে তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনরা ‘আসবাবুন নুযূল’ নিয়ে যেসব গবেষণামূলক বই পুস্তক লিখেছেন তার সবটাই ছিলো হাদীস ভিত্তিক। কারণ উমাইয়া খলীফা হযরত ওমর বিন আবদুল আযীযের হাতে হাদীসশাস্ত্রের যে সংকলন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো তা এ সময় পর্যন্ত এসে অনেকটাই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণেই এ সময়ে রচিত প্রাচীন তাফসীরগুলোর এক বিরাট অংশ জুড়েই আমরা হাদীসে রসূলের প্রচুর রেফারেন্স দেখতে পাই। অবশ্য যার ওপর কোরআন নাযিল হয়েছে তাঁর চেয়ে বেশী কে- সে কোরআনের ব্যাখ্যা করতে পারবে। গ্রহণ যোগ্যতার দিক থেকে সাহাবায়ে কেরামের প্রদত্ত ব্যাখ্যাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের বহু আয়াতের ঐতিহাসিক পারিপার্শ্বিকর্তা এই সৌভাগ্যবান সাহাবায়ে কেরামের সাথেই জড়িত। কোরআনের কোন্ আয়াতটি কোন্ ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে- কিংবা কোন্ সাহাবীর কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে নাযিল হয়েছে- তা তাদের চাইতে কে আর ভালো করে বলতে পারবে? আরাফার ময়দানে আগত ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের দিন যে ১,২৪,০০০ নিবেদিত মানুষ উপস্থিত ছিলেন তারাই হচ্ছেন মূল ‘আসহাবুল কোরআন’। তাফসীর ‘ফি যিলালিল কোরআন’-এর রচয়িতা সাইয়েদ কুতুব শহীদের ভাষায় এরা হচ্ছেন ‘কোরআনিক জেনারেশান’। আজ আমাদের হাতে আল্লাহ তায়ালার যে কিতাবটি মজুদ আছে তার ‘আসবাবুন নুয়ল’ জানার জন্যে আমরা বহুলাংশেই এই ‘আসহাবুল কোরআন’ কোরআনিক জেনারেশানের ওপর নির্ভর করি। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যমানার কোরআনের মনীষারা যে বিষয়টাকে ‘আসবাবুন নুযুল’ বলেছেন তাকেই পরবর্তী সময়ের অনারব মোফাসসেররা বলেছেন- ‘শানে নয়ল’। অর্থ ও ভাবের দিক থেকে উভয়টাই এক- যা ‘আসবাবুন নুযুল’ তাই ‘শানে নুযুল’। ইতিহাসের এ পর্যায়ে মনীষী কোরআন সাধকরা ‘আসবাবুন নুযূল’-এর ওপর অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন এর মধ্যে পঞ্চদশ শতকের খ্যাতনামা মোফাসসের আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (র.)-এর লুবাবুন নকুল’- একটি মূল্যবান সংযোজন। শানে নুযুলের এই প্রাসংগিক কথাগুলো শেষ করার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি অনুসন্ধিৎসু কোরআন পাঠকদের বলতে চাই। ‘শানে নুযূলে’র বিষয়টাকে আমাদের এলমী মহলে- কোরআন চর্চার পরিমণ্ডলে মাঝে মাঝে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনেকেই মনে করেন কোরআনের প্রত্যেকটি আয়াতেরই বুঝি আলাদা আলাদা ‘শানে নুযূল’ আছে। আসলে কোরআনুল কারীমের অধিকাংশ আয়াতই হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার সরাসরি আদেশ নিষেধ ও বিধি বিধান সংক্রান্ত। এসব আয়াত বুঝার জন্যে অহেতুক ‘শানে নুযুলে’র পেছনে পড়ার দরকার নেই। হাঁ, সূরা হিসেবে প্রত্যেকটি সূরারই আলাদা আলাদা ‘শানে নুযূল’ আছে এবং সে শানে নুযুলগুলো ভালো করে জানার ওপরই আমরা সমধিক গুরুত্ব দিয়েছি। কোরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াতের ভিন্ন ভিন্ন শানে নুযূল না থাকলেও সামগ্রিকভাবে কোরআনের যে নিজস্ব একটি ‘শানে নুযূল’ আছে একথাটি আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টি- আশরাফুল মাখলুকাতের জন্যে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় মানুষটির মাধ্যমে সর্বোত্তম ভাষায় এ গ্রন্থটি নাযিল করেছেন। নাযিল করেছেন সর্বোত্তম শহরে বছরের শ্রেষ্ঠ মাসের শ্রেষ্ঠতম রাতে ও ফেরেশতাকূলের সর্বোত্তম মর্যাদাবান সরদারের মাধ্যমে। এই ৭টি শ্রেষ্ঠত্ব ও ৭টি সর্বোত্তম বিষয়ের সমাহার হচ্ছে ৭ মনযিলের এই কোরআনুল কারীম। এই ৭টি সর্বোত্তম বিষয় দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ‘মানুষ’কে সত্যিকার অর্থেই ‘সর্বোত্তম’ বানাতে চেয়েছেন। এটাই হচ্ছে কোরআনের শানে নুযূল, আর কোরআনের শানে নুযূল বুঝার জন্যে সীরাতুন্নবী চর্চারও কোনো বিকল্প নেই। উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়শা যথার্থই বলেছেন, ‘রসূলের চরিত্রই হচ্ছে কোরআন’। আল্লাহর যমীনে কোরআন চর্চার সুযোগ সুবিধে অনেকেই মনে করেন এখন দিনে দিনে সংকুচিত- ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষ কিছু কিছু জনপদে নির্বাসিত হতে শুরু করেছে। জানি না বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এ উদ্বেগ উৎকণ্ঠাকে আমরা কিভাবে দূরীভূত করবো। আমরা শুধু কোরআনের মালিকের দুয়ারে আমাদের আবেগ উচ্ছ্বাসটুকুই নিবেদন করতে পারি। প্রায় শত বছর চেষ্টা করেও যারা মধ্য এশিয়ার কোটি কোটি মুসলমানদের কোরআন থেকে দূরে রাখতে পারেনি, তাদের কলা কৌশলের দৌড় ঝাঁপ সম্পর্কে সজাগ থাকার পাশাপাশি আমার একান্ত আপনজন- বিশেষ করে আগামী প্রজন্মের কান্ডারীদের আমি ব্যাপক কোরআন চর্চার দিকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাবো। হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিত ইমাম বোখারীর স্মৃতিবিজড়িত সমরকন্দ বোখারা আমাদের আরেকবার এ সত্যটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যতো দুর্যোগই আসুক না কেন- কোনো জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন কোরআন থেকে দূরে রাখা যায় না; বরং যারা এ জঘন্য তৎপরতায় মেতে ওঠে তারাই এক সময় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। মুসলিম জাতির নিকট ও দূরের ইতিহাস বারবার আমাদের কাছে তাই প্রমাণ করেছে। যে আল্লাহ রব্বুল আলামীন ‘৪ গজ বাই পৌণে ২ গজের’ একটি ক্ষুদ্র গুহায় অবতীর্ণ কোরআন দিয়ে পঁচিশ হাজার মাইলের এ পৃথিবীটাকে আলোকিত করেছেন সে আল্লাহ তায়ালা কোরআনের সংরক্ষণের জন্যে একাই যথেষ্ট। মানবজাতির প্রতি এটা আল্লাহ তায়ালার অনেক বড়ো দয়া যে, হাজারো বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও যুবক ও কিশোরদের একটি বড়ো অংশ এখন দেশে দেশে কোরআন চর্চায় এগিয়ে আসছে। এক দীর্ঘ অন্ধকার রজনী শেষে মনে হয় পৃথিবীর এখানে সেখানে কোরআনের নতুন সূর্য উদয় হতে শুরু করেছে। আনন্দের কথা, দুনিয়া জোড়া এই বড়ো পরিবর্তন থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও এখন আর বাইরে নয়। এখানে অনেকেই এখন ধীরে ধীরে কোরআনের আলোয় পথ চলতে শুরু করেছেন। যারা কোরআন পড়তে চান, যারা কোরআন বুঝতে চান, যারা কোরআন দিয়ে জীবন গড়তে চান সর্বোপরি যারা এই কোরআনকে দুনিয়ার অন্য মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে চান, তাদের জীবনের মুহূর্তগুলোকে কিছুটা মসৃণ করার এক ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবেই আমরা এই মহান গ্রন্থটি তাদের হাতে অর্পন করলাম।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ‘অর্পণ’-টুকু কবুল করুন।
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮, ডিসেম্বর ২০১৬ লন্ডন |
| পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬৭২
সাইজ: ৬ × ৯.১ ইঞ্চি কভার: হার্ড কভার প্রিন্ট: সাদা কালো কাগজ: ৫৫ গ্রাম অফসেট ওজন: ০.৮ কেজি |
| অর্ডার করার পর সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে ডেলিভারি প্রদান করা হয়।
ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা। (অফিস ডেলিভারি ও হোম ডেলিভারি দু’ব্যবস্থাই রয়েছে) |
| শর্তাবলি:
যদি কোনো পৃষ্ঠা ছেড়া ফাটা থাকে ফর্মা মিসিং হয় কভার উল্টা অথবা ছেড়া হয় এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্সচেঞ্জ দিয়ে থাকি। |

সূরাভিত্তিক শানে নুযূল (কোরআনুল কারীমের সূরাভিত্তিক শানে নুযূল)
৳ 500.00
কোরআনের যথার্থ মর্ম অনুধাবনের জন্যে একজন কোরআন পাঠককে যেসব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন- ‘কোরআনুল কারীমের সূরাভিত্তিক শানে নুযূল’ তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামগ্রিকভাবে কোরআনুল করীমের ১১৪টি সূরা ছাড়া আরো অনেক আয়াত আছে যেগুলো নাযিল হওয়ার পেছনে নানা শিক্ষণীয় ঘটনা কিংবা সেসব ঘটনার পেছনেও আবার নানা পটভূমি থাকে, যেগুলো না জানলে আল্লাহ তায়ালার বক্তব্যের মূল শিক্ষা অনুধাবন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্যেই একজন নিবেদিতপ্রাণ কোরআন পাঠকের জন্যে কোরআন অনুধাবনের সাথে জড়িত এই বিষয়টির জ্ঞান শেখা এতো জরুরী। প্রায় দেড় যুগ আগে ঠিক এ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যেই ‘আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স’ তার যাত্রা শুরু করেছিলো। বিশ্বের সকল বাংলাভাষী মানুষদের হাতে কোরআন বুঝার উপকরণগুলোকে সহজভাবে তুলে দেয়ার একটি মহান লক্ষ্য ছিলো আমাদের সামনে। আজ আমরা দেড় যুগের বেশী সময় পার করে এসেছি, কিন্তু যে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যে সেদিন আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম তার কটোটুকু আমরা এগুতে পেরেছি? নিজেদের অযোগ্যতা, অক্ষমতা ও উপায় উপকরণের স্বল্পতা সীমাবদ্ধতা আমাদের বার বার পেছনে ঠেলে দিয়েছে, তারপরও আমরা আল্লাহর ফযল ও করম পাওয়ার আশায় সামনের দিকে এগিয়ে গেছি। বাকী পথের জন্যে আমরা শুধুই রাব্বুল আলামীনের ওপর ভরসা করি।
- Book Author: হাফেজ মুনীর উদ্দীন আহমদ

![Book Cover [Converted] কোরআনের পাতায় সন্ত্রাস ও জেহাদ](https://alquranacademypublications.com/wp-content/uploads/2026/02/Book-Cover-Converted-300x400.jpg)



Reviews
There are no reviews yet.