| ‘মোসহাফে ওসমানী‘ থেকে
‘তাফসীরে ওসমানী‘
ভারতীয় উপমহাদেশের বড়ো মাপের কয়েকজন কোরআনের অনুবাদক ও তাফসীরকারকদের মাঝে শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানীর নামদুটোর অবস্থান নি:সন্দেহে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। শত বছর ধরে এ যমীনে কোরআনের বর্ণমালা থেকে এর সমাজ ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সব কয়টি কাজেই এ দু’জনের অসামান্য অবদান চোখে পড়ার মতো। উপমহাদেশের ঐতিহাসিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান দেওবন্দের ইটগুলো আজো যাদের পূণ্যস্মৃতি ধরে রেখেছে- কোরআনের জ্ঞান গরিমা গবেষণার বিশাল ময়দানে তাদেরই বিস্ময়কর কৃতিত্ব হচ্ছে এই অঞ্চলের কোটী মানুষের প্রিয় গ্রন্থ ‘তাফসীরে ওসমানী’।
আমাদের বাপ দাদারা যখন ভারতের শিক্ষা সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে বিজাতীয় দর্শণ ও সে দর্শনের অবশ্যম্ভাবী ফসল পশ্চিমী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুক্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন- তখন এ অঞ্চলের সুধী চিন্তাবিদদের মন মানসে কোরআনুল কারীমের আসল পয়গামটুকু বসিয়ে দেয়ার মহান তাগিদ থেকেই এ উভয় মনীষী এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি রচনা করেন।
ইতিহাসের যে বিশেষ সময়ে ‘তাফসীরে ওসমানী’ রচিত হয়েছে তা ছিলো এ অঞ্চলে মুসলমানদের জন্যে একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল। এই ক্রান্তিকালে মোঘল সাম্রাজ্যের কয়েকশ’ বছরের রাজসিক বিলাসিতা ও জ্ঞান গবেষণায় ক্ষমাহীন স্থবিরতা গোটা জাতির জীবনকে বাইরের ইংরেজি ভাষা সংস্কৃতি ও ভেতরের মূর্তিপূজক জাতি গোষ্ঠীর নগ্নতা ও বেহায়াপনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো। সমগ্র পরিস্থিতি মুসলমানদের সামগ্রিক অস্তিত্বকেই গভীর এক সংকটে ফেলে দিলো। সাধক ও সংস্কারক শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভীর অবদান ধীরে ধীরে শুধু মসজিদ মাদরাসা ও খানকার হুজরাখানায় সীমিত হয়ে গেলো- এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে এ জাতিকে কোরআনের আলোয় পুনরুজ্জীবিত করার জন্যে যেমন কিছু ক্ষণজন্মা মহামানুষের প্রয়োজন ছিলো, তেমনি প্রয়োজন ছিলো বিস্মৃত জাতির সামনে কোরআনের কথাগুলোকে নতুনভাবে পেশ করার।
কোরআনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থ ‘তাফসীরে ওসমানী’ ও তার মহান রচয়িতা শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কোন্ ঐতিহাসিক পটভূমিতে আঞ্জাম দিয়েছেন তা বুঝার জন্যে আমাদের সবাইকে বিগত দুইশ’ বছরের কিছু কিছু ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
ভারত ভূখণ্ডে তখন ইংরেজদের প্রবল দাপট। এই দাপটের মাঝেই উপমহাদেশের সংগ্রামী ওলামায়ে কেরামদের নেতৃত্বে সর্বত্র আন্দোলনের যে ঢেউ উঠে তারই ক্রমধারায় ভারতের বিভিন্ন অংশে নতুন করে কোরআনকে জানার ও কোরআনকে বুঝার এক দুর্বার গণউদ্দীপনা শুরু হয়। কারণ, ভারতীয় মুসলমানদের সবাই এ কথাটি বুঝে নিয়েছে যে-কোরআনের সাথে সম্পর্কহীনতাই আমাদের জাতিকে সীমাহীন দুর্গতিতে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এ দিকে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ধীরে ধীরে ভারতে ইংরেজ শাসনের তেজ কমতে থাকলেও ইংরেজদের অত্যাচার অবিচার কিন্তু মোটেই কমেনি। দেশের আলেম ওলামারাই ছিলেন এসব যুলুম অত্যাচারের প্রথম শিকার। কারণ, শুরু থেকেই ভারতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের একক নেতৃত্ব ছিলো দেশের সম্মানিত আলেম ওলামাদের হাতে। ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরো দেড় দুশ’ বছরে যতো আলেম ওলামা জেলে গিয়েছেন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন, তার এক দশমাংশও অন্য কোনো জাতি গোষ্ঠীর স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাকর্মীরা ভোগ করেননি। সিপাহী বিদ্রোহ, ফারায়েজী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও বালাকোটের সাইয়েদ আহমদ ও ইসমাঈল শহীদ-এর আন্দোলনে সবসময়ই দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ওলামারাই ছিলেন সবার আগে। বালাকোটের ময়দানে নিজেদের বুকের। তাজা খুন ভারতীয় রাজনীতির অশনি সংকেতকে কিছুটা সময়ের জন্যে রুখতে পারলেও অসুস্থ জাতির হৃদয় থেকে জ্ঞানের স্থবিরতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধাত্য দূর করতে পারেনি।
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী ঠিক মতোই এ কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শত বছরের জমে থাকা বন্ধাত্য ও অন্ধকার দূর করার একমাত্র জিয়নকাঠি হচ্ছে কোরআনুল করীম। মুসলিম জাতিকে যতো দ্রুত কোরআনের কাছে আনা যাবে এবং কোরআনকে যতো দ্রুত তাদের কাছে নেয়া যাবে, ততোই এ জাতি আবার জাতি হিসেবে এ যমীনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
তদানিন্তন ভারতের সকল দল মতের আলেম ওলামাদের ইংরেজ বিরোধী ক্যাম্পে এনে জড়ো করার অপরাধে শায়খুল হিন্দ ইংরেজদের প্রবল তোপের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে ইংরেজরা তাকে গভীর সমুদ্রের দ্বীপ ‘মাল্টা’-য় বন্দী করলো। সেখানে লৌহ প্রাচীরের অন্তরালে সুদীর্ঘ ৪টি বছর কাটাবার পর শায়খুল হিন্দ শারীরিকভাবে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইংরেজরা প্রমাদ গুনলো- যদি তাদের জেলে শায়খুল হিন্দ মারা যান, তাহলে ভারতের মাটি আরো উত্তপ্ত হবে। এ আশংকা থেকেই তারা অবশেষে তাকে ভারতের মাটিতে এনে মুক্ত করে দিলো।
শায়খুল হিন্দ ভারতের মাটিতে পা রেখেই তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক দেওবন্দ মাদরাসায় ভারতের সবকয়টি দল ও মতের ওলামা মাশায়েখদের এক সম্মেলন আহ্বান করলেন। শত শত আলেম ও কোরআনের সাথীদের জন্যে আহুত এই সর্বদলীয় সম্মেলনে শায়খুল হিন্দ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সাথীদের জেলখানা ও জেলখানায় অর্জিত তার অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তিনি আবেগে ভেঙ্গে পড়েন। মুসলমানদের যাবতীয় সংকট ও লাঞ্ছনা গঞ্জনা, বিপদ আপদের জন্যে তিনি কোরআনের সাথে তাদের নির্মম উদাসীনতাকেই দায়ী করেন। তিনি বললেন, দীর্ঘ ৪ বছরের কারাপ্রকোষ্ঠের নির্জনতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাকে এ কথা বলে দিয়েছে যে, ভারতসহ বিশ্বের সব কয়টি জনপদের মুসলমানদের অপমান ও অধপতনের একমাত্র কারণ হচ্ছে কোরআনের অনুসারী ও কোরআনের বাহকরা আজ কোরআন থেকে দূরে সরে গেছে। এ জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের একটাই রহস্য এবং তা হচ্ছে এ জাতিটাকে আবার কোরআনের সাথে জুড়ে দিতে হবে। আসলে এ কোরআন হচ্ছে এমন এক অটুট রশি- যার এক প্রান্ত স্বয়ং আল্লাহর হাতে থাকার কারণে এর অনুসারীদের কখনো পা পিছলে পড়ার আশঙ্কা থাকে না।
শায়খুল হিন্দ ভারতীয় ওলামাদের দেওবন্দ সম্মেলনে গোটা জাতিকে যেভাবে কোরআনের সাথে জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন তারই সূত্র ধরে দেশের আনাচে কানাচে, পাড়ায় পল্লিতে, শহরে বন্দরে ও নগরে কোরআনের যেভাবে হাজার হাজার, লাখ লাখ পাঠশালা গড়ে উঠেছে, তা এই সেই দিন পর্যন্তও অব্যাহত ছিলো। জানি না আবার কবে এ যমীনের গ্রামে গঞ্জে, মাঠে ঘাটে কোরআনের চর্চা শুরু হবে, কবে এ জাতির কর্ণধাররা শায়খুল হিন্দ ও আমাদের অন্যান্য পূর্বপুরুষদের মতো করে এ কথাটা বুঝতে পারবেন যে, মুসলমান জাতির উন্নতি, অবনতি, উত্থান, পতন সব কিছুই আসলে কোরআনের সাথে জড়িত। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রা.)-এর বর্ণিত বিখ্যাত হাদীস- কোরআন হচ্ছে এমন এক গ্রন্থ যা জাতিকে যেমন উন্নতির উন্নত শিখরে পৌঁছে দেয়, তেমনি তা জাতিকে পতনের সর্ব নিম্নস্তরেও পৌঁছে দেয়।
জাতির ক্লান্তিলগ্নে শায়খুল হিন্দ যখন জেলে বসেই তাদের উদ্ধার কর্মসূচীর অস্ত্র হিসেবে পুনরায় তাদের কোরআনের সাথে জুড়ে দেয়ার কথা ভাবছিলেন, তখনই তিনি কোরআনের সহজবোধ্য উর্দু অনুবাদের এ মৌলিক কাজটি শুরু করেছিলেন। তিনি জানতেন মুসলমানদের আবার কোরআনের সাথে জুড়ে দেয়ার জন্যে কোরআনের সেতুবন্ধন হিসেবে কোরআনের একটি সুন্দর ও সহজবোধ্য অনুবাদের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, মুসলিম সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠী যদি সহজ ভাষায় কোরআনের কথাগুলো বুঝতে না পারে, তা হলে কোরআনকে তারা নিজেদের জীবনের কর্মসূচী বানাবে কি করে?
আসলে এই স্বপ্নের সাথেই এক সময় ‘তাফসীরে ওসমানী’-র মহান যাত্রা শুরু হলো। শায়খুল হিন্দ মাল |

তাফসীরে ওসমানী তাফসীরে ওসমানী (২য় খণ্ড)
৳ 400.00
ভারতের প্রাচীনতম দ্বীনী প্রতিষ্ঠান দেওবন্দের প্রাক্তন প্রধান শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী রচিত ‘তাফসীরে ওসমানী’। ইংরেজদের কারাগারে বসে হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান এই তাফসীর গ্রন্থটি লিখতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে তারই যোগ্য উত্তরসূরী মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী তাফসীরটির অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন। কোরআনের মনযিলের সাথে সংগতি রেখে এ তাফসীরটিকে সর্বমোট ৭ খণ্ডে ভাগ করা হয়েছে।
- Book Author: হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ
