তাফসীরে ওসমানী তাফসীরে ওসমানী (৩য় খণ্ড)

ভারতের প্রাচীনতম দ্বীনী প্রতিষ্ঠান দেওবন্দের প্রাক্তন প্রধান শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী রচিত ‘তাফসীরে ওসমানী’। ইংরেজদের কারাগারে বসে হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান এই তাফসীর গ্রন্থটি লিখতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে তারই যোগ্য উত্তরসূরী মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী তাফসীরটির অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন। কোরআনের মনযিলের সাথে সংগতি রেখে এ তাফসীরটিকে সর্বমোট ৭ খণ্ডে ভাগ করা হয়েছে।

মোসহাফে ওসমানীথেকে

তাফসীরে ওসমানী

 

ভারতীয় উপমহাদেশের বড়ো মাপের কয়েকজন কোরআনের অনুবাদক ও তাফসীরকারকদের মাঝে শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানীর নামদুটোর অবস্থান নি:সন্দেহে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। শত বছর ধরে এ যমীনে কোরআনের বর্ণমালা থেকে এর সমাজ ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সব কয়টি কাজেই এ দু’জনের অসামান্য অবদান চোখে পড়ার মতো। উপমহাদেশের ঐতিহাসিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান দেওবন্দের ইটগুলো আজো যাদের পূণ্যস্মৃতি ধরে রেখেছে- কোরআনের জ্ঞান গরিমা গবেষণার বিশাল ময়দানে তাদেরই বিস্ময়কর কৃতিত্ব হচ্ছে এই অঞ্চলের কোটী মানুষের প্রিয় গ্রন্থ ‘তাফসীরে ওসমানী’।

 

আমাদের বাপ দাদারা যখন ভারতের শিক্ষা সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে বিজাতীয় দর্শণ ও সে দর্শনের অবশ্যম্ভাবী ফসল পশ্চিমী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুক্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন- তখন এ অঞ্চলের সুধী চিন্তাবিদদের মন মানসে কোরআনুল কারীমের আসল পয়গামটুকু বসিয়ে দেয়ার মহান তাগিদ থেকেই এ উভয় মনীষী এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি রচনা করেন।

 

ইতিহাসের যে বিশেষ সময়ে ‘তাফসীরে ওসমানী’ রচিত হয়েছে তা ছিলো এ অঞ্চলে মুসলমানদের জন্যে একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল। এই ক্রান্তিকালে মোঘল সাম্রাজ্যের কয়েকশ’ বছরের রাজসিক বিলাসিতা ও জ্ঞান গবেষণায় ক্ষমাহীন স্থবিরতা গোটা জাতির জীবনকে বাইরের ইংরেজি ভাষা সংস্কৃতি ও ভেতরের মূর্তিপূজক জাতি গোষ্ঠীর নগ্নতা ও বেহায়াপনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো। সমগ্র পরিস্থিতি মুসলমানদের সামগ্রিক অস্তিত্বকেই গভীর এক সংকটে ফেলে দিলো। সাধক ও সংস্কারক শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভীর অবদান ধীরে ধীরে শুধু মসজিদ মাদরাসা ও খানকার হুজরাখানায় সীমিত হয়ে গেলো- এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে এ জাতিকে কোরআনের আলোয় পুনরুজ্জীবিত করার জন্যে যেমন কিছু ক্ষণজন্মা মহামানুষের প্রয়োজন ছিলো, তেমনি প্রয়োজন ছিলো বিস্মৃত জাতির সামনে কোরআনের কথাগুলোকে নতুনভাবে পেশ করার।

 

কোরআনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থ ‘তাফসীরে ওসমানী’ ও তার মহান রচয়িতা শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কোন্ ঐতিহাসিক পটভূমিতে আঞ্জাম দিয়েছেন তা বুঝার জন্যে আমাদের সবাইকে বিগত দুইশ’ বছরের কিছু কিছু ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

 

ভারত ভূখণ্ডে তখন ইংরেজদের প্রবল দাপট। এই দাপটের মাঝেই উপমহাদেশের সংগ্রামী ওলামায়ে কেরামদের নেতৃত্বে সর্বত্র আন্দোলনের যে ঢেউ উঠে তারই ক্রমধারায় ভারতের বিভিন্ন অংশে নতুন করে কোরআনকে জানার ও কোরআনকে বুঝার এক দুর্বার গণউদ্দীপনা শুরু হয়। কারণ, ভারতীয় মুসলমানদের সবাই এ কথাটি বুঝে নিয়েছে যে-কোরআনের সাথে সম্পর্কহীনতাই আমাদের জাতিকে সীমাহীন দুর্গতিতে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এ দিকে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ধীরে ধীরে ভারতে ইংরেজ শাসনের তেজ কমতে থাকলেও ইংরেজদের অত্যাচার অবিচার কিন্তু মোটেই কমেনি। দেশের আলেম ওলামারাই ছিলেন এসব যুলুম অত্যাচারের প্রথম শিকার। কারণ, শুরু থেকেই ভারতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের একক নেতৃত্ব ছিলো দেশের সম্মানিত আলেম ওলামাদের হাতে। ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরো দেড় দুশ’ বছরে যতো আলেম ওলামা জেলে গিয়েছেন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন, তার এক দশমাংশও অন্য কোনো জাতি গোষ্ঠীর স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাকর্মীরা ভোগ করেননি। সিপাহী বিদ্রোহ, ফারায়েজী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও বালাকোটের সাইয়েদ আহমদ ও ইসমাঈল শহীদ-এর আন্দোলনে সবসময়ই দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ওলামারাই ছিলেন সবার আগে। বালাকোটের ময়দানে নিজেদের বুকের। তাজা খুন ভারতীয় রাজনীতির অশনি সংকেতকে কিছুটা সময়ের জন্যে রুখতে পারলেও অসুস্থ জাতির হৃদয় থেকে জ্ঞানের স্থবিরতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধাত্য দূর করতে পারেনি।

 

শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান ও শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী ঠিক মতোই এ কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শত বছরের জমে থাকা বন্ধাত্য ও অন্ধকার দূর করার একমাত্র জিয়নকাঠি হচ্ছে কোরআনুল করীম। মুসলিম জাতিকে যতো দ্রুত কোরআনের কাছে আনা যাবে এবং কোরআনকে যতো দ্রুত তাদের কাছে নেয়া যাবে, ততোই এ জাতি আবার জাতি হিসেবে এ যমীনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

 

তদানিন্তন ভারতের সকল দল মতের আলেম ওলামাদের ইংরেজ বিরোধী ক্যাম্পে এনে জড়ো করার অপরাধে শায়খুল হিন্দ ইংরেজদের প্রবল তোপের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে ইংরেজরা তাকে গভীর সমুদ্রের দ্বীপ ‘মাল্টা’-য় বন্দী করলো। সেখানে লৌহ প্রাচীরের অন্তরালে সুদীর্ঘ ৪টি বছর কাটাবার পর শায়খুল হিন্দ শারীরিকভাবে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইংরেজরা প্রমাদ গুনলো- যদি তাদের জেলে শায়খুল হিন্দ মারা যান, তাহলে ভারতের মাটি আরো উত্তপ্ত হবে। এ আশংকা থেকেই তারা অবশেষে তাকে ভারতের মাটিতে এনে মুক্ত করে দিলো।

 

শায়খুল হিন্দ ভারতের মাটিতে পা রেখেই তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক দেওবন্দ মাদরাসায় ভারতের সবকয়টি দল ও মতের ওলামা মাশায়েখদের এক সম্মেলন আহ্বান করলেন। শত শত আলেম ও কোরআনের সাথীদের জন্যে আহুত এই সর্বদলীয় সম্মেলনে শায়খুল হিন্দ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সাথীদের জেলখানা ও জেলখানায় অর্জিত তার অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তিনি আবেগে ভেঙ্গে পড়েন। মুসলমানদের যাবতীয় সংকট ও লাঞ্ছনা গঞ্জনা, বিপদ আপদের জন্যে তিনি কোরআনের সাথে তাদের নির্মম উদাসীনতাকেই দায়ী করেন। তিনি বললেন, দীর্ঘ ৪ বছরের কারাপ্রকোষ্ঠের নির্জনতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাকে এ কথা বলে দিয়েছে যে, ভারতসহ বিশ্বের সব কয়টি জনপদের মুসলমানদের অপমান ও অধপতনের একমাত্র কারণ হচ্ছে কোরআনের অনুসারী ও কোরআনের বাহকরা আজ কোরআন থেকে দূরে সরে গেছে। এ জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের একটাই রহস্য এবং তা হচ্ছে এ জাতিটাকে আবার কোরআনের সাথে জুড়ে দিতে হবে। আসলে এ কোরআন হচ্ছে এমন এক অটুট রশি- যার এক প্রান্ত স্বয়ং আল্লাহর হাতে থাকার কারণে এর অনুসারীদের কখনো পা পিছলে পড়ার আশঙ্কা থাকে না।

 

শায়খুল হিন্দ ভারতীয় ওলামাদের দেওবন্দ সম্মেলনে গোটা জাতিকে যেভাবে কোরআনের সাথে জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন তারই সূত্র ধরে দেশের আনাচে কানাচে, পাড়ায় পল্লিতে, শহরে বন্দরে ও নগরে কোরআনের যেভাবে হাজার হাজার, লাখ লাখ পাঠশালা গড়ে উঠেছে, তা এই সেই দিন পর্যন্তও অব্যাহত ছিলো। জানি না আবার কবে এ যমীনের গ্রামে গঞ্জে, মাঠে ঘাটে কোরআনের চর্চা শুরু হবে, কবে এ জাতির কর্ণধাররা শায়খুল হিন্দ ও আমাদের অন্যান্য পূর্বপুরুষদের মতো করে এ কথাটা বুঝতে পারবেন যে, মুসলমান জাতির উন্নতি, অবনতি, উত্থান, পতন সব কিছুই আসলে কোরআনের সাথে জড়িত। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রা.)-এর বর্ণিত বিখ্যাত হাদীস- কোরআন হচ্ছে এমন এক গ্রন্থ যা জাতিকে যেমন উন্নতির উন্নত শিখরে পৌঁছে দেয়, তেমনি তা জাতিকে পতনের সর্ব নিম্নস্তরেও পৌঁছে দেয়।

 

জাতির ক্লান্তিলগ্নে শায়খুল হিন্দ যখন জেলে বসেই তাদের উদ্ধার কর্মসূচীর অস্ত্র হিসেবে পুনরায় তাদের কোরআনের সাথে জুড়ে দেয়ার কথা ভাবছিলেন, তখনই তিনি কোরআনের সহজবোধ্য উর্দু অনুবাদের এ মৌলিক কাজটি শুরু করেছিলেন। তিনি জানতেন মুসলমানদের আবার কোরআনের সাথে জুড়ে দেয়ার জন্যে কোরআনের সেতুবন্ধন হিসেবে কোরআনের একটি সুন্দর ও সহজবোধ্য অনুবাদের একান্ত প্রয়োজন। কারণ, মুসলিম সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠী যদি সহজ ভাষায় কোরআনের কথাগুলো বুঝতে না পারে, তা হলে কোরআনকে তারা নিজেদের জীবনের কর্মসূচী বানাবে কি করে?

 

আসলে এই স্বপ্নের সাথেই এক সময় ‘তাফসীরে ওসমানী’-র মহান যাত্রা শুরু হলো। শায়খুল হিন্দ মাল্টার কারাগারে বসেই এই অনুবাদকর্মটি শুরু করেছিলেন। অনুবাদ কর্মটি শেষ করে মাত্র ৬ পারা পর্যন্তই তিনি সংক্ষিপ্ত তাফসীর লিখতে পেরেছিলেন। ইতিমধ্যে তার কাছে রব্বুল আলামীনের ডাক এলো। তিনি এই নশ্বর ধরাকে ‘আল বিদা’ বলে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন। তার অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কোরআনুল কারীমের অবশিষ্ট ২৪ পারার তাফসীর করেছেন তার যোগ্য উত্তরসূরী শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী। তার জ্ঞান গরিমা ও মেধাদীপ্ত প্রতিভা দিয়ে তিনি এর সাথে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সম্বলিত কিছু টীকা সংযোজন করে দিয়েছেন। এটাই পরবর্তী কালের কোরআনের সাথীদের মাঝে ‘তাফসীরে ওসমানী’ নামে পরিচিতি ও খ্যাতি পেয়েছে।

 

আজ আপনার হাতে ‘তাফসীরে ওসমানী’-র যে কপিটি আছে তা এই দু’জন কোরআন সাধকের দীর্ঘ গবেষণা নিস্মৃত প্রচেষ্টারই এক উত্তম ফসল। উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এ উত্তম ফসলই এক সময় কোরআনের বিশেষ মহিরূহে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের এ কোরআন সাধনাকে কবুল করুন।

 

হ্যাঁ, আমি আমার সম্মানিত পাঠকদের এই তাফসীরটি রচনার কিছু ঐতিহাসিক পটভূমিকার কথা বলছিলাম। এ তাফসীরটি রচিত হওয়ার পর অনেকগুলো দশক অতিবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু আজো এই মহান তাফসীরের প্রয়োজন ঠিক সেদিনের মতোই অপরিবর্তিত আছে- যেদিন এটি রচিত হয়েছিলো।

 

এই মহান তাফসীরটির সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের দিনক্ষণ ডায়েরীর পাতায় লেখা না থাকলেও কোরআনের পরিবেশে লালিত হওয়ার সুবাদে এই পরিবারের প্রাণ পুরুষ আমার জান্নাতী পিতা শায়খুল হিন্দের দারুল উলুম দেওবন্দের ‘ফারেগুত তাহসীল’ (ডিগ্রিধারী। হযরত মাওলানা মানসুর আহমদ এর ব্যক্তিগত পাঠাগারেই সম্ভবত এই তাফসীরটির সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে। আমার মরহুম পিতার ব্যক্তিগত পাঠাগারে এই তাফসীরের পাশাপাশি আরো অনেকগুলো মূল্যবান তাফসীর শোভা পেতো: কিন্তু এই তাফসীরটির বৈশিষ্ট্য ছিলো কিছুটা ভিন্ন। এটি ইবনে কাছীর ও যিলালিল কোরআনের মতো আকারে অতো বড়ো না হলেও ভাব প্রকাশে ছিলো খুবই কমপ্রিহেনসিভ- অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। শায়খুল হিন্দের সুন্দর অনুবাদের পাশে সংক্ষেপে কিছু টীকা সংযোজন করে মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী। একটি মূল্যবান ও সুন্দর তাফসীর মুসলিম জাতির হাতে তুলে দিয়েছেন- তাফসীর সাহিত্যে। যার তুলনা সত্যিই বিরল। সম্ভবত এর এ অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রায় সাত দশক ধরে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বীনী মাদরাসাসমূহে এখনও এটি সিলেবাসভুক্ত।

 

আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও কোরআনের ম্যাসেজ তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ তাফসীরটির সত্যিই। কোনো জুড়ি নেই। বাংলাভাষায় এই তাফসীরটিকে অনুবাদ, করার কথা আমাকে প্রথমে বলেছেন আমাদেরই ঘনিষ্ঠ সুহৃদ হাফেজ মওলানা গোলাম সোবহান সিদ্দীকী। হাফেজ সিদ্দীকী জ্ঞান গরিমা ও বয়সের দিক থেকে আমার অনেক সিনিয়র একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি আমার বড়ো ভাইয়ের ক্লাসমেট। ষাটের দশকের শুরুর দিকে আমি যখন ফেনী আলিয়া। মাদরাসায় পড়ি, তখন তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। তারপর থেকে জীবনের অনেকগুলো বছর কোরআনের বিভিন্ন মনযিলে আমরা এক সাথে পথ চলেছি। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বরকত দিয়ে তাকে ঢেকে দিন- এই কামনা করি।

 

তিনি যেদিন আমার হাতে এই পুরো তাফসীরের বাংলা অনুবাদের পাণ্ডুলিপিটা তুলে দিয়েছিলেন সেদিন আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। শত শত পাতার বিশাল বিশাল তিনটি ফাইল- দশ পারা করে তিনটি আলাদা আলাদা কভারে মোড়ানো। একজন মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়। তার মরহুম পিতাও ছিলেন একজন বড়ো মাপের আলেমে দ্বীন ও হাফেজে কোরআন। তার ছিলো বড়ো স্বপ্ন, আর সে স্বপ্ন নিয়েই মৃত্যুর আগে ছেলের হাতে কোরআনের। এই মূল্যবান তাফসীরটি তুলে দিয়েছেন বাংলায় অনুবাদ করার জন্যে। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান হাফেজ মাওলানা গোলাম সোবহান সিদ্দীকী কোরআনের প্রতি সবটুকু ভালোবাসা নিবেদন করে পিতার স্বপ্ন পূরণ করলেন। অনুবাদের হাজার পৃষ্ঠার বিশাল বান্ডিল তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন। অতপর আমি আমার ঢাকা আলিয়া মাদরাসার ওস্তাদ ও জাতীয় মসজিদের খতীব সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও ‘তাফসীরে ওসমানী’-র একজন ভক্ত পাঠক মাওলানা ওবায়দুল হকসহ দেশের সম্মানিত আলেমদের নিয়ে ঢাকায় এর জমকালো একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। আগত আলেমদের সাথে হাফেজ গোলাম সোবহান সিদ্দীকী নিজেও এই মহান তাফসীরের পটভূমিকা নিয়ে শ্রোতাদের সামনে কিছু আবেগময় কথা বলেছেন।

 

হাফেজ গোলাম সোবহান সিদ্দীকী সেদিন তার আবেগময় কথার ফাঁকে এই তাফসীরটির পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঢাকার বাংলাবাজার ও ইসলামপুরের বড়ো বড়ো প্রকাশকদের দ্বারে ঘারে কিভাবে ঘুরেছেন তারও কিছু বর্ণনা প্রদান করেন।

 

এ সময় ‘আল কোরআন একাডেমী লন্ডন’ সাইয়েদ কুতুব শহীদ-এর কালজয়ী গ্রন্থ ‘তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন’-এর মাত্র দুই খণ্ড প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে আমাদের প্রকাশনা কার্যক্রম তখনও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। তারপরও এই মূল্যবান তাফসীরটির ঐতিহাসিক পটভূমিকা, এর ভাব ও ভাষার সমৃদ্ধি- সর্বোপরি কোরআনের মূল বক্তব্য বোঝানোর ক্ষেত্রে এর অপরূপ বৈশিষ্ট্য আমাকে এর প্রকাশনায় হাত দিতে বাধ্য করেছে। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমরা এই ঐতিহাসিক তাফসীরের দু’টি খণ্ড (১ম ও ৭ম) প্রকাশ করেছি। এরপর গত দুই দশকের বেশী সময় ধরে এই মহান তাফসীরের আর কোনো খণ্ড আমরা বের করতে পারিনি। জানি না- আজ ২০/২১ বছর পর আমি এর কী অজুহাত পেশ করবো। আসলে দুনিয়ার কোন কাজটি কখন সম্পন্ন হবে, তা যেহেতু আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালাই সিদ্ধান্ত করেন, তাই শুধু এটুকুই আজ বলবো, আল্লাহ তায়ালা যা চান তাই হয়।

 

আজ আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে দীর্ঘ বিরতির পর পুরানো ফাইলপত্র ঝেড়ে মুছে আমরা তাফসীরের অবশিষ্ট খণ্ডগুলো বের করার নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করলাম। আশা করা যায়, এখন থেকে বিরতিহীনভাবে বাকি খণ্ডগুলো বের হতে থাকবে- ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফীক দান করুন।

 

এই গ্রন্থটি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রথমেই আমরা সমস্যায় পড়লাম কোরআনের বাংলা তরজমা নিয়ে। মূল তাফসীরে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান-এর যে তরজমা রয়েছে তার বাংলা রূপান্তর করতে গিয়ে দেখা গেলো, তা কোরআনের শুধুই শাব্দিক অনুবাদ। যার মর্ম উপলব্ধি করা জনসাধারণের জন্যে একটু কষ্টকরই হবে। অবশেষে বাংগালী পাঠকদের মাঝে কোরআনের বক্তব্যকে সহজভাবে বুঝানোর প্রয়োজনে আমরা এই তাফসীরের পাতায় কোরআনের ভিন্ন অনুবাদ ব্যবহার করলাম। এই অনুবাদ আমার নিজের, সুতরাং এর দায় দায়িত্বও সম্পূর্ণ আমার। হে আল্লাহ তুমি আমার ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ো।

 

এ অনুবাদ সংযোজন করতে গিয়ে আমরা পড়লাম আরেক সমস্যায়। মাওলানা ওসমানী তার ওস্তাদ হযরত মাহমুদুল হাসানের তরজমাকে সামনে রেখেই এর টিকা লিখেছেন, কিন্তু আমরা যখন কোরআনের ভিন্ন তরজমা ব্যবহার করেছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মাঝে মাঝে তরজমার সাথে টিকার কিছুটা অসংগতি দেখা দিয়েছে। কারণ যে শব্দটির যে ব্যাখ্যা তিনি করেছেন, সেই শব্দটি আদৌ হয়তো আমাদের অনুদিত লেখায় আসেইনি। আবার আসলেও বাংলা ভাষার বাক্য রীতিতে হয়তো তা স্থানান্তর হয়ে টিকার নম্বরের আগে কিংবা পরে বসে গেছে। এই সব সমস্যা যে আমরা সর্বাংশে সমাধান করতে পেরেছি- সে কথা বলার সাহস আমার নেই, তবে আমরা আমাদের চেষ্টায় ত্রুটি করিনি এটুকুই আমি সাহস করে বলতে। পারি। টিকার নং বসাতে গিয়েও মাঝে মাঝে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। তরজমা এবং তাফসীরের পার্থক্য বুঝানোর জন্যে আমরা অবশ্য সর্বত্রই একটা স্বতন্ত্র রেখা টেনে দিয়েছি।

 

তারপরও এর পাতায় পাতায় আরো যে অসংখ্য ভুল ত্রুটি রয়ে গেছে তার কৈফিয়ত আমি কিভাবে দেবো-

 

আমার নিজের কর্মস্থল বাংলাদেশ থেকে ৭/৮ হাজার মাইল দূরে থাকার কারণে যাতোবারই তাফসীরের খন্ডগুলো ছাপার জন্যে আমি ঢাকায় যাই, ততোবারই আমাকে একাজে কিছুটা তাড়াহুড়ো করতে হয়। সীমিত সময়ের ভেতর অনুবাদগুলোকে যথারীতি সম্পাদনা করতে হয়, আবার সম্পাদিত পান্ডুলিপিটি মূল কপির সাথে মিলিয়ে তার সংশোধন ও তদারক করতে হয়। এছাড়াও রয়েছে এই বিশাল তাফসীরের মুদ্রণ ও প্রকাশনার সাথে জড়িত আরো বহু ধরনের জটিলতা। ওদিকে আবার রাজনৈতিক অশান্তি ও অস্থিরতা থেকেও তো আমাদের দেশ মুক্ত নয়। একথা স্বীকার করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই যে, আমরা আসলেই কোরআনের এই মহামূল্যবান সম্পদের যথার্থ ‘হক’ আদায় করতে। পারিনি। হে মালিক, তুমি আমাদের ভেতরের দিকে তাকিয়ে বাইরের এই অক্ষমতাগুলোকে। ক্ষমা করে দিয়ো।

 

আমার অনুপস্থিতিতে অনুবাদ কাজের সম্পাদনায় আমাকে নিরবিচ্ছিন্ন সহযোগিতা দিয়েছে- আমার একান্ত স্নেহের হাফেজ মাওলানা আবু নায়ীম ও আমাদের বাংলাদেশ কার্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ সহকর্মীরা। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়। দান করুন।

 

আমি গুনাহগারের জীবনের সকল কাজের পেছনেই প্রেরণা ও উৎসাহ রয়েছে আমার। জীবন সাথী- সুলেখিকা খাদিজা আখতার রেজায়ীর। ‘আদ দা’ল্লো আ’লাল খায়রে কা ফা’য়েলিহী’ (যে যাকে যতোটুকু ভালো কাজের পথ দেখালো- সে ঠিক তারই সমান বিনিময়। পাবে)। প্রিয় নবীর হাদীস অনুযায়ী তার জন্যে আজ আমার তো মুখ খুলে কিছুই চাওয়ার প্রয়োজন নেই। যার ভান্ডারে কোনো অভাব নেই তার কাছে চাওয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য দেখিয়ে কি লাভ?

 

আল্লাহ তায়ালা মূল উর্দু গ্রন্থের মতো বাংলা অনুবাদটিকেও কবুল করুন। এর সাথে সম্পৃক্ত সবাইকে জাযায়ে খায়র দান করুন।

 

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

লন্ডন

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪০০

সাইজ: ৬.২ × ৯.৪ ইঞ্চি

কভার: হার্ড কভার

প্রিন্ট: সাদা কালো

কাগজ: ৫৫ গ্রাম অফসেট

ওজন: ০.৬ কেজি

অর্ডার করার পর সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে ডেলিভারি প্রদান করা হয়।

ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা। (অফিস ডেলিভারি ও হোম ডেলিভারি দু’ব্যবস্থাই রয়েছে)

শর্তাবলি:

যদি কোনো পৃষ্ঠা ছেড়া ফাটা থাকে

ফর্মা মিসিং হয়

কভার উল্টা অথবা ছেড়া হয়

এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্সচেঞ্জ দিয়ে থাকি।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “তাফসীরে ওসমানী তাফসীরে ওসমানী (৩য় খণ্ড)”

Your email address will not be published. Required fields are marked *