ইয়া রব্বে লাকাল হামদ

৳ 180.00

এ বইর সবগুলো কবিতাই আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে লেখা। এর একটি বড়ো কখনো হাসপাতালে নিজের বেডে, কখনো আবার ভিজিটিং রুমে অপেক্ষা করার অংশ আবার তিনি রচনা করেছেন লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে বসে-সময়ে। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডাক্তার খানা, কেয়ার হোমস ও হসপিস- এসব জায়গায় মানুষের মন এমনিই আল্লাহর প্রতি নিবেদিত থাকে, আর এরই যথার্থ প্রমাণ রয়েছে প্রকাশিত এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার প্রতিটি পংক্তিতে।

ইয়া রব্বে লাকাল হামদ

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

 

প্রিয় নবীর একজন প্রিয় সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা সুন্দর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস গ্রন্থ- সুনানে ইবনে মাজাহ এই হাদীসটি সংকলন করেছেন।

 

আল্লাহর নবী তাঁর সাহাবীদের একটি ঘটনা শুনালেন, একবার আল্লাহর এক বান্দা বললো- ‘আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু কামা ইয়াম্বাগী লে জালালে ওয়াজহেকা ওয়া আযীমে সুলতানেকা’- হে আমার রব, মহা পরাক্রম ও বিপুল প্রতিপত্বির যে ধরনের প্রশংসা তোমার যোগ্য তার সবটুকুই আমি তোমার জন্যে নিবেদন করছি। বান্দার মুখে এই অভিনব প্রশংসা শুনে ‘কেরামান কাতেবীন’ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। তারা এর বদলে তার আমলনামায় কতো নেকী লিখবেন- বুঝতে পারছিলেন না। তারা আল্লাহ তায়ালার দরবারে নিবেদন করলেন, হে আমাদের রব, তোমার এক বান্দা তোমার প্রশংসায় এক অভিনব বাক্য উচ্চারণ করেছে, আমরা বুঝতে পারছি না এ জন্যে কি পরিমাণ নেকী তার আমলনামায় লিখবো। আল্লাহ তায়ালা ভালো করেই জানতেন তাঁর বান্দা কি বলেছে, তারপরও মহান অন্তর্যামী তাদের জিজ্ঞেস করলেন- ‘কি বলেছে আমার বান্দা’? ফেরেশতারা নিবেদন করলেন- হে আমাদের মালিক, তোমার বান্দা বলেছে, ‘ইয়া রব্বে লাকাল হামদু কামা ইয়াম্বাগী লে জালালে ওয়াজহেকা ওয়া আযীমে সুলতানেকা’- আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার বান্দা যা বলেছে তোমরা হুবহু তাই লিখে রাখো, চূড়ান্ত হিসাবের দিন যখন সে আমার সামনে হাযির হবে তখন আমিই তাকে তার প্রতিদান দেবো।

 

সৃষ্টিকুলের সকল প্রশংসা এককভাবে কুল মাখলুকাতের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার জন্যে নিবেদন করা নিয়ে প্রিয়নবীর আরেকটি হাদীস বলছি। সাহাবী হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে হাদীস গ্রন্থ তিরমিযী শরীফে। এ হাদীসে আল্লাহর নবী বলেন, ‘মানব সন্তানের সর্বোত্তম যেকের হচ্ছে- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আর তাদের সর্বোত্তম দোয়া হচ্ছে ‘আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন’। আরবী ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী এখানে ‘আল হামদু’ মানে সকল ধরনের প্রশংসা, সকল ধরনের তারীফ। প্রিয় নবীর ভাষায় বাকী কথাগুলো হচ্ছে- ‘আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু কুলুহু, ওয়া লাকাল মুলকু কুলুহু, ওয়া বেইয়াদিকাল খায়রু কুলুহু, ওয়া ইলাইকা ইয়ারজিউর আমরু কুলুহু’-হে আল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা তোমারই জন্যে, সকল ক্ষমতা শুধুই তোমার, সকল কল্যাণ তোমারই হাতের মুঠোয় এবং সকল বিষয় শুধু তোমার জন্যে নিবেদিত।

 

সৃষ্টির শুরু থেকেই স্রষ্টার জন্যে এই প্রশংসা নিবেদন করেছেন তাঁর নবী রসূল ও তাঁদের হাজার কোটি অনুসারীরা। প্রশংসা করতে গিয়ে এই মানুষরা বক্তব্য বিবৃতি ও লেখাপড়ার কোনোটাই বাদ রাখেননি। যুগে যুগে হৃদয় নিংড়ানো গান কবিতা দিয়েও আল্লাহর প্রেমিকরা আল্লাহর জন্যে তাদের ভালোবাসা নিবেদন করেছে।

 

বাংলা সাহিত্যে কবে থেকে কবিতার প্রচলন শুরু হয়েছে- সে কথা দিন তারিখ দিয়ে বলতে না পারলেও এ বিষয়টি মনে হয় ইতিহাসের আলোকে নির্ধিদ্বায়ই বলা যায় যে, বাংলা ভাষায় কবিতা এসেছে বাংলা গদ্যের বহু আগে। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবেগময়ী মেঠো কবি ও তবলার বাউলরা কবিতায় কিছুটা যাত্রা বিরতি দিয়ে বাংলা ভাষায় এই গদ্য ধারার চর্চা শুরু করেন। আজ বিশ্ব সাহিত্যে যে বাংলা প্রচলিত রয়েছে- তা সে ঐতিহাসিকতারই একটি সফল বিবর্তন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আরেকটি ধারা ছিলো ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক প্রাচীন পুঁথি সাহিত্য। এই পুঁথি সাহিত্যের ওপর ভর করেই এক সময় এখানে মাঠে ময়দানে গাঁয়ে গঞ্জে কবিতার প্রচলন শুরু হয়। তবে বিশ্বময় বাংলা সাহিত্যের যে ধারা এখন চালু আছে, বলা যায় তা সাহিত্যের এই গদ্য ধারার দাপটেই সম্ভব হয়েছে। বিশ্ব সাহিত্যের কোন্ আসনটির কোন্ ধারা কে কখন অলংকৃত করেছে সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, সার্বজ নীন গদ্যের মতো কবিতাও আজ আমাদের সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। বাংলা কবিতাও এখন বাংলা গদ্যের মতো শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

 

ঈসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনেরও প্রায় সাড়ে ৩শ’ বছর আগের কথা। ভূমধ্য সাগরের পাদদেশ বয়ে পারস্য উপকূল ও বেলুচিস্তান হয়ে উন্নত ও সংস্কৃতিবান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা ভারতবর্ষে আগমন করেছিলেন ঐতিহাসিক গবেষকরা তাদের উত্তরসূরীদেরই ‘দ্রাবিড়’ বলে পরিচয় করিয়েছেন। এই দ্রাবিড়দের হাতেই ভারতের নগর সভ্যতা ও সংস্কৃতির গোড়াপত্তন শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক শতকের ইতিহাস তাই প্রমাণ করে।

 

বাংলা কবিতার প্রথম স্বর্ণযুগ ছিলো ১২ থেকে ১৮শ’ সাল পর্যন্ত। এই যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে ছিলেন- দৌলত কাজী, আলাওল, সাইফুল মুল্ক বদিউয যামান, সৈয়দ সুলতান, শাহ সগীর, কবি মরদন ও কবি আবদুল হাকিমসহ আরো অনেক।

 

এ সময়ে মুসলিম শাসক, সুলতান ও নবাবরা বাংলা ভাষার যে সমৃদ্ধি সাধন করেছিলেন নিসন্দেহে কবিতা সাহিত্যে তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তারা যে শুধু ভারত ভূমেই বাংলা কবিতাকে উন্নত মর্যাদায় সমাসীন করেছেন তাই নয়- তাদের আমলে বাংলা কবিতার সাথে বিশ্ব কবিতার ‘শে’র শায়েরীর’রও যুগসূত্র সাধিত হয়েছে। সুলতান গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ এই সময়ে পারস্য কবি সম্রাট হাফিজকেও বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ওমর খৈয়াম, মাওলানা রুমী, মোল্লা জামী ও শেখ সা’দীর মতো বিশ্ব বরেণ্য মুসলিম কবিদের সাথে বাংলা কবিদের ঐতিহাসিক যুগসূত্র স্থাপনের সময়কালও এটা। এই যোগসূত্রের কারণেই বিদেশী মহাকবিদের মহাকাব্যগুলোর সাথে বাংলার কোটি কোটি মানুষের পরিচয় ঘটে। ‘কাসীদাতুল বোরদা’, ‘শাহ নামা’, ‘মসনবী’, ‘দেওয়ানে হাফিজ’, ‘গুলিস্তা’, ‘বোস্তাঁ’ ও ‘আশেক নামা’র নাম না জানা মানুষের সংখ্যা এই বাংলায় এখনো বিরল।

 

কবিতা- চিরকালই মানুষের মনে নান্দনিকতার ছোঁয়া লাগায়। এ কারণেই দেখা যায় ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সাহিত্যের অন্যান্য ধারার তুলনায় কবিতার প্রতি একটু বেশী পক্ষপাতিত্ব দেখায়। কবিতায় আবেগ থাকে, কবিতায় ভালোবাসা থাকে, কবিতায় রোমান্টিকতা থাকে। কবি মানুষরাও বাস্তবাদীতার তুলনায় একটু বেশী আবেগময়, বেশী ইমোশনাল, বেশী রোমান্টিক হয়। প্রায়ই দেখা যায়, সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার থেকে মানুষরা বেছে বেছে শুধু কবিতাগুলোকেই সংরক্ষণ করে। প্রিয় নবীর জন্মের আগে আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে যারা জাহেল ছিলো, তারা তাদের সেরা কবিতাগুলো আল্লাহর যে অবিস্মরণীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সাবয়া মোয়াল্লাকা’ তৈরী হলো- তাকে এক দিনের জন্যেও ইতিহাস আমাদের দৃষ্টির আড়াল হতে দেয়নি। কবিতার প্রতি মানুষদের কোরআনের পাতায় ‘কবিদের’ (আশ শোয়ারা) নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাও এ পক্ষপাতিত কিংবা অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে সম্ভবত আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেছেন। সেখানে আল্লাহ তায়ালা এ কবিদের কথা বলেছেন, ‘আর (ভোগবাদী) কবিরা! একান্ত পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই তাদের অনুসরণ করে; তুমি কি দেখতে পাও না, ওরা (কল্পনার হাওয়ায় চড়ে) প্রতিটি ময়দানে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়।’ (সূরা আশ শোয়ারা, আয়াত ২২৪-২২৫)

 

গদ্যের তুলনায় পদ্য ও গান কবিতা মানুষদের হৃদয়কে নানাভাবে দোলা দেয় বলে এগুলোর আবেদন সবসময় একটু বেশী পরিলক্ষিত হয়। রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর প্রতি আইয়ামে জাহেলিয়াতের কিছু জাহেল কবির কটূক্তির প্রতিবাদ জানানোর জন্যে তাঁর দরবারের কবি হযরত হাসসান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহর নবী এটা ভালো করেই জানতেন যে, সাহিত্যের কোন্ ধারার প্রভাব কতো বেশী। তাই যখনি কোনো কবি তার কবিতার ছন্দে কুল মাখলুকাতের মালিক আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করতেন, তখন প্রিয় নবী খশী হতেন, তাকে তিনি আরো উৎসাহ দিতেন। সাহিত্যের এই বিশেষ ধারা অর্থাৎ কবিতার প্রতি প্রিয়নবীর এ উৎসাহের কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে মুসলিম সমাজে হাজার হাজার মুসলিম কবির জন্ম হয়েছে- যারা কবিতার মাধ্যমে মানব জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য সভ্যতা সংস্কৃতিতে এমন সব অবদান রেখে গেছেন যার জন্যে পরবর্তী বংশধররা চিরদিন তাদের প্রতি শà§