সম্পাদকের নিবেদন
আহনাফ বিন কায়স নামক একজন আরব সর্দারের কথা বলছি।
তিনি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। তার সাহস ও শৌর্য ছিলো অপরিসীম। তার তলোয়ারে ছিলো লক্ষ যোদ্ধার জোর। ইসলাম গ্রহণ করার পর আল্লাহর নবী (স.)-কে দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি, তবে নবীর বহু সাথীকেই তিনি দেখেছেন। এদের মধ্যে হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিলো অপরিসীম।
একদিন তার সামনে এক ব্যক্তি কোরআনের এ আয়াতটি পড়লেন, ‘আমি তোমাদের কাছে এমন একটি কিতাব নাযিল করেছি, যাতে ‘তোমাদের কথা’ আছে, অথচ তোমরা চিন্তা-ভাবনা করো না।’ (সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ১০)
আহনাফ ছিলেন আরবী সাহিত্যে গভীর পারদর্শী ব্যক্তি। তিনি ভালো করেই বুঝতেন- ‘যাতে তোমাদের কথাই আছে’ এ কথার অর্থ কি? তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন, কেউ বুঝি তাকে আজ নতুন কিছু শোনালো। মনে মনে বললেন, ‘আমাদের কথা’ আছে, কই কোরআন নিয়ে আসো তো? দেখি এতে ‘আমার’ কথা কোথায় আছে? তার সামনে কোরআন মাজীদ আনা হলো, এতে একে একে বিভিন্ন দল উপদলের পরিচিতি পেশ করা হচ্ছে।
একদল লোক এলো, তাদের পরিচয় এভাবে পেশ করা হলো, ‘এরা রাতের বেলায় খুব কম ঘুমায়, শেষ রাতে তারা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ-খাতার জন্যে মাগফেরাত কামনা করে।’ (সূরা আয যারিয়াত, আয়াত ১৭-১৯)
আবার একদল লোক এলো, যাদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘তাদের পিঠ রাতের বেলায় বিছানা থেকে আলাদা থাকে, তারা নিজেদের প্রতিপালককে ডাকে ভয় ও প্রত্যাশা নিয়ে, তারা অকাতরে আমার দেয়া রেযেক থেকে খরচ করে।’ (সূরা হা-মীম আস সাজদা, আয়াত ১৬)
কিছুদূর এগিয়ে যেতেই তার পরিচয় হলো আরেক দল লোকের সাথে। তাদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘রাতগুলো তারা নিজেদের মালিকের সাজদা ও দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেয়।’ (সূরা আল ফোরকান, আয়াত ৬৪)
অতপর এলো আরেক দল মানুষ, এদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘এরা দারিদ্র ও স্বাচ্ছন্দ্য উভয় অবস্থায় (আল্লাহর নামে) অর্থ ব্যয় করে, এরা রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, এরা মানুষদের ক্ষমা করে, বস্তুত আল্লাহ তায়ালা এসব নেককার লোকদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)
এলো আরেকটি দল, তাদের পরিচয় এভাবে পেশ করা হলো, ‘এরা (বৈষয়িক প্রয়োজনের সময়) অন্যদের নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের নিজেদের রয়েছে প্রচুর অভাব ও ক্ষুধার তাড়না। যারা নিজেদের কার্পণ্য থেকে দূরে রাখতে পারে তারা বড়োই সফলকাম।’ (সূরা আল হাশর, আয়াত ৯)
একে একে এদের সবার কথা ভাবছেন আহনাফ। এবার কোরআন তার সামনে আরেক দল লোকের কথা পেশ করলো, ‘এরা বড়ো বড়ো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, যখন এরা রাগান্বিত হয় তখন (প্রতিপক্ষকে) মাফ করে দেয়, এরা আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলে, এরা নামায প্রতিষ্ঠা করে, এরা নিজেদের মধ্যকার কাজকর্মগুলো পরামর্শের ভিত্তিতে আঞ্জাম দেয়। আমি তাদের যা দান করেছি তা থেকে তারা অকাতরে ব্যয় করে।’ (সূরা আশ্-শূরা, আয়াত ৩৭-৩৮)
হযরত আহনাফ নিজেকে নিজে ভালো করেই জানতেন। আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত এ লোকদের কথাবার্তা দেখে তিনি বললেন, হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তো এ বইয়ের কোথাও ‘আমাকে’ খুঁজে পেলাম না। আমার কথা কই? আমার ছবি তো এর কোথাও আমি দেখলাম না, অথচ এ কিতাবে নাকি তুমি সবার কথাই বলেছো।
এবার তিনি ভিন্ন পথ ধরে কোরআনে নিজের ছবি খুঁজতে শুরু করলেন। এ পথেও তার সাথে বিভিন্ন দল উপদলের সাক্ষাত হলো। প্রথমত, তিনি পেলেন এমন একটি দল, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তখন তারা গর্ব ও অহংকার করে এবং বলে, আমরা কি একটি পাগল ও কবিয়ালের জন্যে আমাদের মাবুদদের পরিত্যাগ করবো?’ (সূরা আছ ছাফফাত, আয়াত ৩৫-৩৬)
তিনি আরো সামনে এগুলেন, দেখলেন আরেক দল লোক। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন এদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় তখন এদের অন্তর অত্যন্ত নাখোশ হয়ে পড়ে, অথচ যখন এদের সামনে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্যদের কথা বলা হয় তখন এদের মন আনন্দে নেচে ওঠে।’ (সূরা আঝ ঝুমার, আয়াত ৪৫)
তিনি আরো দেখলেন, কতিপয় হতভাগ্য লোককে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ‘তোমাদের কিসে জাহান্নামের এ আগুনে নিক্ষেপ করলো? তারা বলবে, আমরা নামায প্রতিষ্ঠা করতাম না, আমরা গরীব মেসকীনদের খাবার দিতাম না, কথা বানানো যাদের কাজ- আমরা তাদের সাথে মিশে সে কাজে লেগে যেতাম। আমরা শেষ বিচারের দিনটিকে অস্বীকার করতাম, এভাবেই একদিন মৃত্যু আমাদের সামনে এসে হাযির হয়ে গেলো।’ (সূরা আল মোদ্দাসসের, আয়াত ৪২-৪৬)
হযরত আহনাফ কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের মানুষের বিভিন্ন চেহারা ছবি ও তাদের ‘কথা’ দেখলেন। বিশেষ করে এ শেষোক্ত লোকদের অবস্থা দেখে মনে মনে বললেন, হে আল্লাহ, এ ধরনের লোকদের ওপর আমি তো ভয়ানক অসন্তুষ্ট। আমি এদের ব্যাপারে তোমার আশ্রয় চাই। এ ধরনের লোকদের সাথে আমার কোনোই সম্পর্ক নেই।
তিনি নিজেকে নিজে ভালো করেই চিনতেন, তিনি কোনো অবস্থায়ই নিজেকে এ শেষের লোকদের দলে শামিল বলে ধরে নিতে পারলেন না, কিন্তু তাই বলে তিনি নিজেকে প্রথম শ্রেণীর লোকদের কাতারেও শামিল করতে পারছেন না। তিনি জানতেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে ঈমানের দৌলত দান করেছেন। তার স্থান যদিও প্রথম দিকের সম্মানিত লোকদের মধ্যে নয়, কিন্তু তাই বলে তার স্থান মুসলমানদের বাইরেও তো নয়!
তার মনে নিজের ঈমানের যেমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, তেমনি নিজের গুনাহ খাতার স্বীকৃতিও সেখানে সমানভাবে মজুদ ছিলো। কোরআনের পাতায় তাই এমন একটি ছবির সন্ধান তিনি করছিলেন, যাকে তিনি একান্ত ‘নিজের’ বলতে পারেন। তার সাথে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা এবং দয়ার প্রতিও তিনি ছিলেন গভীর আস্থাশীল। তিনি নিজের নেক কাজগুলোর ব্যাপারে যেমন খুব বেশী অহংকারী ও আশাবাদী ছিলেন না, তেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকেও নিরাশ ছিলেন না। কোরআনের পাতায় তিনি এমনি একটি ভালো-মন্দ মেশানো মানুষের ছবিই খুঁজছিলেন এবং তার একান্ত বিশ্বাস ছিলো, এমনি একটি মানুষের ছবি অবশ্যই তিনি এ জীবন্ত পুস্তকের কোথাও না কোথাও পেয়ে যাবেন।
কেন- তারা কি আল্লাহর বান্দা নয় যারা ঈমানের ‘দৌলত’ পাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের গুনাহ্র ব্যাপারে থাকে একান্ত অনুতপ্ত। কেন- আল্লাহ তায়ালা কি এদের সত্যিই নিজের অপরিসীম রহমত থেকে মাহরূম রাখবেন? এ কিতাবে যদি সবার কথা থাকতে পারে তাহলে এ ধরনের লোকের কথা থাকবে না কেন? এ কিতাব যেহেতু সবার, তাই এখানে তার ছবি কোথাও থাকবে না- এমন তো হতেই পারে না। তিনি হাল ছাড়লেন না। এ পুস্তকে নিজের ছবি খুঁজতে লাগলেন। আবার তিনি কিতাব খুললেন।
কোরআনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় সত্যিই হযরত আহনাফ ‘নিজেকে’ উদ্ধার করলেন। খুশীতে তার মন ভরে ওঠলো, আজ তিনি কোরআনে নিজের ছবি খুঁজে পেয়েছেন, সাথে সাথেই বলে ওঠলেন, হ্যাঁ, এ তো আমি!
‘হ্যাঁ, এমন ধরনের কিছু লোকও আছে যারা নিজেদের গুনাহ স্বীকার করে। এরা ভালো মন্দ মিশিয়ে কাজকর্ম করে- কিছু ভালো কিছু মন্দ। আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা এদের ক্ষমা করে দেবেন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা বড়ো দয়ালু- বড়ো ক্ষমাশীল। (সূরা আত্ তাওবা, আয়াত ১০২)
হযরত আহনাফ আল্লাহর কিতাবে নিজের ছবি খুঁজে পেয়ে গেলেন, বললেন, হাঁ, এতোক্ষণ পর আমি আমাকে উদ্ধার করেছি। আমি আমার গুনাহর কথা অকপটে স্বীকার করি, আমি যা কিছু ভালো কাজ করি তাও আমি অস্বীকার করি না। এটা যে আল্লাহর
| সম্পাদকের নিবেদন
আহনাফ বিন কায়স নামক একজন আরব সর্দারের কথা বলছি। তিনি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। তার সাহস ও শৌর্য ছিলো অপরিসীম। তার তলোয়ারে ছিলো লক্ষ যোদ্ধার জোর। ইসলাম গ্রহণ করার পর আল্লাহর নবী (স.)-কে দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি, তবে নবীর বহু সাথীকেই তিনি দেখেছেন। এদের মধ্যে হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিলো অপরিসীম। একদিন তার সামনে এক ব্যক্তি কোরআনের এ আয়াতটি পড়লেন, ‘আমি তোমাদের কাছে এমন একটি কিতাব নাযিল করেছি, যাতে ‘তোমাদের কথা’ আছে, অথচ তোমরা চিন্তা-ভাবনা করো না।’ (সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ১০) আহনাফ ছিলেন আরবী সাহিত্যে গভীর পারদর্শী ব্যক্তি। তিনি ভালো করেই বুঝতেন- ‘যাতে তোমাদের কথাই আছে’ এ কথার অর্থ কি? তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন, কেউ বুঝি তাকে আজ নতুন কিছু শোনালো। মনে মনে বললেন, ‘আমাদের কথা’ আছে, কই কোরআন নিয়ে আসো তো? দেখি এতে ‘আমার’ কথা কোথায় আছে? তার সামনে কোরআন মাজীদ আনা হলো, এতে একে একে বিভিন্ন দল উপদলের পরিচিতি পেশ করা হচ্ছে। একদল লোক এলো, তাদের পরিচয় এভাবে পেশ করা হলো, ‘এরা রাতের বেলায় খুব কম ঘুমায়, শেষ রাতে তারা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ-খাতার জন্যে মাগফেরাত কামনা করে।’ (সূরা আয যারিয়াত, আয়াত ১৭-১৯) আবার একদল লোক এলো, যাদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘তাদের পিঠ রাতের বেলায় বিছানা থেকে আলাদা থাকে, তারা নিজেদের প্রতিপালককে ডাকে ভয় ও প্রত্যাশা নিয়ে, তারা অকাতরে আমার দেয়া রেযেক থেকে খরচ করে।’ (সূরা হা-মীম আস সাজদা, আয়াত ১৬) কিছুদূর এগিয়ে যেতেই তার পরিচয় হলো আরেক দল লোকের সাথে। তাদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘রাতগুলো তারা নিজেদের মালিকের সাজদা ও দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেয়।’ (সূরা আল ফোরকান, আয়াত ৬৪) অতপর এলো আরেক দল মানুষ, এদের সম্পর্কে বলা হলো, ‘এরা দারিদ্র ও স্বাচ্ছন্দ্য উভয় অবস্থায় (আল্লাহর নামে) অর্থ ব্যয় করে, এরা রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, এরা মানুষদের ক্ষমা করে, বস্তুত আল্লাহ তায়ালা এসব নেককার লোকদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪) এলো আরেকটি দল, তাদের পরিচয় এভাবে পেশ করা হলো, ‘এরা (বৈষয়িক প্রয়োজনের সময়) অন্যদের নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের নিজেদের রয়েছে প্রচুর অভাব ও ক্ষুধার তাড়না। যারা নিজেদের কার্পণ্য থেকে দূরে রাখতে পারে তারা বড়োই সফলকাম।’ (সূরা আল হাশর, আয়াত ৯) একে একে এদের সবার কথা ভাবছেন আহনাফ। এবার কোরআন তার সামনে আরেক দল লোকের কথা পেশ করলো, ‘এরা বড়ো বড়ো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, যখন এরা রাগান্বিত হয় তখন (প্রতিপক্ষকে) মাফ করে দেয়, এরা আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলে, এরা নামায প্রতিষ্ঠা করে, এরা নিজেদের মধ্যকার কাজকর্মগুলো পরামর্শের ভিত্তিতে আঞ্জাম দেয়। আমি তাদের যা দান করেছি তা থেকে তারা অকাতরে ব্যয় করে।’ (সূরা আশ্-শূরা, আয়াত ৩৭-৩৮) হযরত আহনাফ নিজেকে নিজে ভালো করেই জানতেন। আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত এ লোকদের কথাবার্তা দেখে তিনি বললেন, হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তো এ বইয়ের কোথাও ‘আমাকে’ খুঁজে পেলাম না। আমার কথা কই? আমার ছবি তো এর কোথাও আমি দেখলাম না, অথচ এ কিতাবে নাকি তুমি সবার কথাই বলেছো। এবার তিনি ভিন্ন পথ ধরে কোরআনে নিজের ছবি খুঁজতে শুরু করলেন। এ পথেও তার সাথে বিভিন্ন দল উপদলের সাক্ষাত হলো। প্রথমত, তিনি পেলেন এমন একটি দল, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তখন তারা গর্ব ও অহংকার করে এবং বলে, আমরা কি একটি পাগল ও কবিয়ালের জন্যে আমাদের মাবুদদের পরিত্যাগ করবো?’ (সূরা আছ ছাফফাত, আয়াত ৩৫-৩৬) তিনি আরো সামনে এগুলেন, দেখলেন আরেক দল লোক। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন এদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় তখন এদের অন্তর অত্যন্ত নাখোশ হয়ে পড়ে, অথচ যখন এদের সামনে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্যদের কথা বলা হয় তখন এদের মন আনন্দে নেচে ওঠে।’ (সূরা আঝ ঝুমার, আয়াত ৪৫) তিনি আরো দেখলেন, কতিপয় হতভাগ্য লোককে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ‘তোমাদের কিসে জাহান্নামের এ আগুনে নিক্ষেপ করলো? তারা বলবে, আমরা নামায প্রতিষ্ঠা করতাম না, আমরা গরীব মেসকীনদের খাবার দিতাম না, কথা বানানো যাদের কাজ- আমরা তাদের সাথে মিশে সে কাজে লেগে যেতাম। আমরা শেষ বিচারের দিনটিকে অস্বীকার করতাম, এভাবেই একদিন মৃত্যু আমাদের সামনে এসে হাযির হয়ে গেলো।’ (সূরা আল মোদ্দাসসের, আয়াত ৪২-৪৬) হযরত আহনাফ কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের মানুষের বিভিন্ন চেহারা ছবি ও তাদের ‘কথা’ দেখলেন। বিশেষ করে এ শেষোক্ত লোকদের অবস্থা দেখে মনে মনে বললেন, হে আল্লাহ, এ ধরনের লোকদের ওপর আমি তো ভয়ানক অসন্তুষ্ট। আমি এদের ব্যাপারে তোমার আশ্রয় চাই। এ ধরনের লোকদের সাথে আমার কোনোই সম্পর্ক নেই। তিনি নিজেকে নিজে ভালো করেই চিনতেন, তিনি কোনো অবস্থায়ই নিজেকে এ শেষের লোকদের দলে শামিল বলে ধরে নিতে পারলেন না, কিন্তু তাই বলে তিনি নিজেকে প্রথম শ্রেণীর লোকদের কাতারেও শামিল করতে পারছেন না। তিনি জানতেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে ঈমানের দৌলত দান করেছেন। তার স্থান যদিও প্রথম দিকের সম্মানিত লোকদের মধ্যে নয়, কিন্তু তাই বলে তার স্থান মুসলমানদের বাইরেও তো নয়! তার মনে নিজের ঈমানের যেমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, তেমনি নিজের গুনাহ খাতার স্বীকৃতিও সেখানে সমানভাবে মজুদ ছিলো। কোরআনের পাতায় তাই এমন একটি ছবির সন্ধান তিনি করছিলেন, যাকে তিনি একান্ত ‘নিজের’ বলতে পারেন। তার সাথে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা এবং দয়ার প্রতিও তিনি ছিলেন গভীর আস্থাশীল। তিনি নিজের নেক কাজগুলোর ব্যাপারে যেমন খুব বেশী অহংকারী ও আশাবাদী ছিলেন না, তেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকেও নিরাশ ছিলেন না। কোরআনের পাতায় তিনি এমনি একটি ভালো-মন্দ মেশানো মানুষের ছবিই খুঁজছিলেন এবং তার একান্ত বিশ্বাস ছিলো, এমনি একটি মানুষের ছবি অবশ্যই তিনি এ জীবন্ত পুস্তকের কোথাও না কোথাও পেয়ে যাবেন। কেন- তারা কি আল্লাহর বান্দা নয় যারা ঈমানের ‘দৌলত’ পাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের গুনাহ্র ব্যাপারে থাকে একান্ত অনুতপ্ত। কেন- আল্লাহ তায়ালা কি এদের সত্যিই নিজের অপরিসীম রহমত থেকে মাহরূম রাখবেন? এ কিতাবে যদি সবার কথা থাকতে পারে তাহলে এ ধরনের লোকের কথা থাকবে না কেন? এ কিতাব যেহেতু সবার, তাই এখানে তার ছবি কোথাও থাকবে না- এমন তো হতেই পারে না। তিনি হাল ছাড়লেন না। এ পুস্তকে নিজের ছবি খুঁজতে লাগলেন। আবার তিনি কিতাব খুললেন। কোরআনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় সত্যিই হযরত আহনাফ ‘নিজেকে’ উদ্ধার করলেন। খুশীতে তার মন ভরে ওঠলো, আজ তিনি কোরআনে নিজের ছবি খুঁজে পেয়েছেন, সাথে সাথেই বলে ওঠলেন, হ্যাঁ, এ তো আমি! ‘হ্যাঁ, এমন ধরনের কিছু লোকও আছে যারা নিজেদের গুনাহ স্বীকার করে। এরা ভালো মন্দ মিশিয়ে কাজকর্ম করে- কিছু ভালো কিছু মন্দ। আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা এদের ক্ষমা করে দেবেন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা বড়ো দয়ালু- বড়ো ক্ষমাশীল। (সূরা আত্ তাওবা, আয়াত ১০২) হযরত আহনাফ আল্লাহর কিতাবে নিজের ছবি খুঁজে পেয়ে গেলেন, বললেন, হাঁ, এতোক্ষণ পর আমি আমাকে উদ্ধার করেছি। আমি আমার গুনাহর কথা অকপটে স্বীকার করি, আমি যা কিছু ভালো কাজ করি তাও আমি অস্বীকার করি না। এটা যে আল্লাহর একান্ত দয়া তাও আমি জানি। আমি আল্লাহর দয়া ও তাঁর রহমত থেকে নিরাশ নই। কেননা এ কিতাবই অন্যত্র বলছে, ‘আল্লাহর দয়া থেকে তারাই নিরাশ হয় যারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট।’ (সূরা আল হেজর, আয়াত ৫৬) হযরত আহনাফ দেখলেন, কোরআনের এ কয়টি কথাগুলোকে একত্রে রাখলে যা দাঁড়ায় তাই হচ্ছে তার ‘ছবি’। কোরআনের মালিক আল্লাহ তায়ালা নিজের এ গুনাহগার বান্দার কথা তাঁর কিতাবে বর্ণনা করতে সত্যি ভুলেননি! হযরত আহনাফ কোরআন পাঠকের কথার সত্যতা অনুধাবন করে নীরবে বলে ওঠলেন হে মালিক, তুমি মহান, তোমার কিতাব মহান, সত্যিই তোমার এ কিতাবে দুনিয়ার গুণী-জ্ঞানী, পাপী-তাপী, ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, সবার কথাই আছে। তোমার কিতাব সত্যিই অনুপম! ভারতীয় উপমহাদেশের মহান ইসলামী চিন্তানায়ক মওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) তার এক রচনায় হযরত আহনাফ বিন কায়সের এ ঐতিহাসিক গল্পটি বর্ণনা করেছেন। হযরত আহনাফের এ গল্পটি পড়ার পর এক সময় আমিও তার মতো কোরআনের পাতায় পাতায় নিজের ছবি খুঁজেছি। খুঁজতে গিয়ে একেকবার হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছি, চিন্তায় ডুবে গেছি বহুবার। সন্ধান করেছি কোরআনের এমন একটি তাফসীরের যা ‘আমাকে’ আমার চোখে আরো পরিচ্ছন্ন করে তুলে ধরবে। আমার আজো সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। ১৯৬৬ সালের আগস্ট মাসের ঢাকার রাজপথ। প্রচন্ড রোদ মাথায় নিয়ে পুরানা পল্টন দিয়ে একটি মিছিল এগিয়ে চলেছে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার দিকে। মিছিলের গগনবিদারী শ্লোগান ঃ মানবতার দুশমন ইসলামের দুশমন নাসের নিপাত যাক, ইখওয়ানকে বেআইনী করা চলবে না, ইখওয়ান নেতা সাইয়েদ কুতুবের মুক্তি চাই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ইসলামের পতাকাবাহী একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে তৌহিদী জনতার এ মিছিলে সেদিন আমিও অংশ গ্রহণ করেছিলাম। মাত্র এক বছর আগে আমি ম্যাট্রিক পাস করেছি। মফস্বল শহর থেকে রাজধানী শহরে এসেছি মাত্র দু’বছর আগে। দেশীয় রাজনীতির কিছুই যেখানে বুঝি না, সেখানে হাজার হাজার মাইলের দূরবর্তী দেশ মিসরে কি হচ্ছে তা জানবো কি করে? আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, এ মিছিলে অংশ গ্রহণের আগে অনেকের মতো আমিও ‘ইখওয়ানুল মুসলেমুন’-এর নেতা সাইয়েদ কুতুব সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানতাম না। এরপর এলো সেই ৬৬ সালের ২৯ আগস্টের কালো রাত্রি। শুনলাম হযরত মূসার পুণ্যভূমি মিসরে ফেরাউনের প্রেতাত্মা জামাল নাসের ইখওয়ানুল মুসলেমুনের বরেণ্য নেতা, মুসলিম জাহানের ক্ষণজন্মা ইসলামী চিন্তানায়ক সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিলো না, ফেরাউন বেঁচে থাকলে সে যে কাজটি করতো, আজ তার এ নিকৃষ্ট অনুসারী তাই-ই করতে উদ্যত হলো! ফেরাউনও এ হুংকার দিয়েছিলো ঃ ‘অবশ্যই আমি বিপরীত দিক থেকে তোমাদের হাত-পা কেটে দেবো, তারপর তোমাদের সবাইকে আমি শূলিতে চড়িয়ে দেবো।’ (সূরা আল আরাফ, ১২৪) আজ এ নরাধম ব্যক্তিটি নবী মূসা, ঈসা ও মোহাম্মদের (আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক তাদের সবার ওপর) অনুসারী কতিপয় বান্দাকে সত্যিই ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিলো! সারা দুনিয়ার মুসলিম জনতার ব্যাপক দাবী দাওয়ার প্রতি যামানার নব্য ফেরাউন কোনো সম্মানই প্রদর্শন করলো না! সাইয়েদ কুতুবের ফাঁসির এ হৃদয়বিদারক ঘটনা দুনিয়ার হাজার হাজার মুসলমানের মতো আমার মনেও তার সম্পর্কে জানার এক ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়ে গেলো। এ মহাপুরুষের জীবনসংগ্রাম, তার সাহিত্য সাধনা, সর্বোপরি ইসলামী আন্দোলনে তার অবদান সম্পর্কে জানার জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে ওঠলাম। আমার এ ব্যাকুলতাই একদিন আমাকে এ অমর চিন্তানায়কের তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। কিভাবে কোন্ সূত্রে এ গ্রন্থ আমি প্রথম দেখেছি তা আজ আর মনে নেই। তবে যদ্দূর মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালে আমি ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক থাকাকালে একবার এ পত্রিকার জন্যে শহীদ কুতুবের ওপর কিছু লেখতে গিয়েই সর্বপ্রথম ‘ফী যিলালিল কোরআন’-এর খোঁজ পাই। ৬৯ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। তাও আবার আমি ছিলাম বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। বাংলা- শহীদ কুতুবের তাফসীরে ব্যবহৃত ভাষার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভাষা। আল্লাহ তায়ালা আমার মরহুম আব্বা হযরত মাওলানা মানসুর আহমদ ও আমার মারহুমা আম্মা মোসাম্মাত জামিলা খাতুনকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন, তাদের চেষ্টা ও সান্নিধ্যে আমি জীবনের প্রথম দিকে কোরআনের ভাষা শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম বলে তার ওপর ভিত্তি করেই এক সময় শহীদ কুতুবের সে কালজয়ী তাফসীরটি পড়তে শুরু করলাম, কিন্তু অচিরেই এটা আমি অনুভব করলাম, আমার জানা যে আরবীর দৌড় কোরআন হাদীস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, তা মোটেই এ কাজের জন্যে যথেষ্ট নয়। ‘ফী যিলালিল কোরআন’-এর আরবীতে প্রচুর পরিমাণ আধুনিকতার মিশ্রণ থাকায় তার মর্মোদ্ধারের জন্যে বুঝতে পারলাম, আমার আরবীর গন্ডিকেও একটু বিস্তৃত করতে হবে। সুযোগ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে ‘ফী যিলালিল কোরআনের’ গহীন সাগরে ডুব দিয়ে এর মুক্তা আহরণের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা কোনোদিনই আমার হয়ে ওঠেনি। তবু আমি কখনো আমার মনে সে আগ্রহের মৃত্যু হতে দেইনি। অতপর ১৯৭৯ সালে লন্ডনে এসে আমি আরবী সাহিত্যের একটা বিস্তৃত পরিসরে পা রাখার সুযোগ পেলাম। আবার সে লালিত আগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠলো, তবে এবার কিছুটা ভিন্ন আকৃতিতে, ভিন্ন ধরনে। ‘ফী যিলালিল কোরআন’ পড়ে এর মর্মোদ্ধার করাই এখন আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, এবার আমার স্বপ্ন এ অমূল্য সৃষ্টিকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা। ১৯৯৪ সালের প্রথম দিককার কথা। ১০ই জানুয়ারী সোমবার সারাদিনের কাজকর্ম সেরে ঘরে ফিরে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী কিছু পড়তে, কিছু লেখতে বসলাম। প্রসংগক্রমে ‘ফী যিলালিল কোরআন’-এর তরজমার কথা এলো, এ গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা জীবনসাথী খাদিজা আখতার রেজায়ীকেই সর্বপ্রথম বললাম। সব নেক কাজের মতো এখানেও সে আমাকে সাহস যোগালো, এমনকি শুরুর দিকে নিজের ‘সেভিংস’ ব্যবহার করার আগ্রহ প্রকাশ করে আমাকে সে গভীর কৃতজ্ঞতাপাশেও আবদ্ধ করে নিলো। কোরআনের মালিকের দরবারে আজ আমি দোয়া করি, জীবনভর ‘কোরআনের ছায়াতলে’ দেয়া তাঁর অগুণতি সহযোগিতার বিনিময়ে তুমিও তাকে ‘আরশের ছায়াতলে’ একান্ত তোমার সান্নিধ্যে রেখো! সেদিনের মুহূর্তটি ছিলো আমার জীবনের এক স্মরণীয় সন্ধ্যা। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লাম। সাথে সাথেই আমি মূল তাফসীর খুলে এর ভূমিকাটা তরজমা করতে শুরু করলাম। কেন যেন নতুন উৎসাহ উদ্দীপনায় আমি ব্যস্ত হয়ে ওঠলাম এ মহান গ্রন্থটি বাংলায় রূপান্তরের জন্যে। সে রাতটি ছিলো ‘লায়লাতুল মেরাজ’। এ রাতেই আল্লাহর আদেশে আল্লাহরই এক নবী আল্লাহর আরশে গমন করলেন এবং মানবজাতির মুক্তির মিশন হাতে নিয়ে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে এলেন। মুক্তির সে মিশনের পথপ্রদর্শক হচ্ছে আল কোরআন। জানি না, এর তরজমার দিনক্ষণটির সাথে এ সম্মানিত রাতের কোনো সম্পর্ক আছে কি না- না এটা নিছক একটি ঘটনামাত্র! ‘ফী যিলালিল কোরআন’ এর ব্যতিক্রমধর্মী নাম দিয়েই এ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যের সন্ধান মেলে (এর মানে হচ্ছে ‘কোরআনের ছায়াতলে’)। ইসলামী জীবনদর্শনের একজন একনিষ্ঠ সাধক তার জীবনের যে দিনগুলো কোরআনের ছায়াতলে কাটিয়েছেন, তারই জ্ঞানলব্ধ অভিজ্ঞতা হচ্ছে ‘ফী যিলালিল কোরআন’। তিনি তার মূল ভূমিকায় এ তাফসীরের প্রতিপাদ্য নিজেই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। লেখকের এ মূল ভূমিকা ‘কোরআনের ছায়াতলে’ সহ আরো কিছু প্রবন্ধ আমরা এ তাফসীরের প্রথম খন্ডে প্রকাশ করেছি। আশাকরি এর সাথে প্রকাশিত এ প্রবন্ধগুলোও আপনার কাজে লাগবে। এক, শহীদের সংগ্রামী জীবনালেখ্য ‘সাইয়েদ কুতুব শহীদ একজন মহান মোফাসসের’, দুই, তারই একটি মূল্যবান প্রবন্ধের বাংলা রূপান্তর ‘আল কোরআনের সাথে আমার সম্পর্ক’, সর্বশেষে যে গ্রন্থটি লেখার জন্যে তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছিলো, সে ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘মায়ালেম ফিত তারীক’-এর ভূমিকা। যে নামে আমরা এর অনুবাদ পেশ করেছি তা হচ্ছে, ‘কোরআনের উপস্থাপিত আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’। মূল তাফসীর পড়ার আগে এ লেখাগুলো একবার পড়ার জন্যে আমি আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাবো। আল কোরআন একটি জীবন্ত গ্রন্থের নাম, আল কোরআন একটি অব্যাহত চালিকা শক্তির নাম, সর্বোপরি আল কোরআন একটি জীবন্ত আন্দোলনের নাম। জাহেলিয়াতের নিকষ আঁধারে নিমজ্জিত একদল মানুষের জীবনকে আলোকমালায় উদ্ভাসিত করার জন্যেই আল্লাহর এক সাহসী বান্দার ওপর এ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিলো। সুতরাং এ কিতাব থেকে হেদায়াত পেতে হলে এ কিতাবের প্রদর্শিত সে সাহসী বান্দার সংগ্রামের পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। আরেকটি কথা, ‘ফী যিলালিল কোরআন’ আরবী কোরআনের আরবী তাফসীর, তাই মূল লেখকের এতে কোরআনের কোনো তরজমা দেয়ার প্রয়োজন হয়নি, কিন্তু আমাদের বাংলাভাষীদের তো সে প্রয়োজন রয়েছে। এ তাফসীরে কোরআনের যে বাংলা অনুবাদ দেয়া হয়েছে তা একান্ত আমার নিজস্ব। এর যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির দায়িত্বও আমার একার। বাজারে প্রচলিত কোনো ‘অনুবাদ’ গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভংগিতে কথ্য ভাষার এক নতুন ‘স্টাইল’ এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। একজন কোরআনের পাঠক শুধু তরজমা পড়েই যেন কোরআনের বক্তব্য বুঝতে পারেন, সেটাই হচ্ছে এ নতুন ধারার লক্ষ্য। অনুবাদের এ নতুন স্টাইলে আমি যদি সফল হই তবে তা হবে একান্তভাবে আমার মালিকেরই দয়া, আর ব্যর্থ হলে তা হবে আমারই অযোগ্যতা ও অক্ষমতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যখন আমি ‘তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন’ সমাপ্ত করার সীমাহীন তাগাদায় দিন কাটাচ্ছিলাম, তখন এ নতুন ধারার অনুবাদটিকে আলাদা গ্রন্থাকারে পেশ করার স্বপ্ন বহুবারই আমার মনে এসেছে। আল্লাহ তায়ালার হাজার শোকর, এখন সে প্রতীক্ষিত স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশেষে ২০০২-এর মার্চ মাসে ঢাকায় ‘কোরআন শরীফ ঃ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ’ গ্রন্থটির উদ্বোধনী উৎসব সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী পরিষদের বিশিষ্ট সদস্যরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ভাইস চ্যান্সেলর, দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম, কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকসহ দেশের বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি এতে উপস্থিত ছিলেন। সে থেকে শুরু করে গত কয়েক মাসে এ গ্রন্থটির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কোরআনপিপাসু অনেকের মনেই নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। আল্লাহ তায়ালার অগণিত বান্দার কাছে এখন কোরআন বুঝা যেন আগের চেয়ে কিছুটা সহজ মনে হচ্ছে। এ কিতাবের পাতায় তারা এখন দেখতে পেলো, আল্লাহ তায়ালা কোরআনকে আসলেই বান্দার জন্যে সহজ করে নাযিল করেছেন। নিযুত কোটি সাজদা আল্লাহ তায়ালার দরবারে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর একজন নিবেদিত কোরআন কর্মীর দিবস রজনীর পরিশ্রম কবুল করেছেন। হে আল্লাহ! মহাবিচারের দিন আমি তোমার শুধু ক্ষমাটুকুই চাই। আমি আর বেশীক্ষণ আপনাদের এ অশান্ত বিয়াবানে অপেক্ষা করাবো না। আমরা সবাই এখন এক সাথে ‘ফী যিলালিল কোরআন’ তথা কোরআনের ছায়াতলে আশ্রয় নেবো। কোরআনের এ সুনিবিড় ছায়াতল আমাদের দুনিয়া আখেরাতে সার্বিক প্রশান্তি আনয়ন করুক, এর ছায়াতলে এসে যেন আমরা সবাই এ কিতাবে নিজের ছবি আরো পরিষ্কার করে দেখি এবং সে মোতাবেক নিজেকে যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত করে তুলতে পারি, এ মহান গ্রন্থটি প্রকাশনার মুহূর্তে গ্রন্থের মালিকের দরবারে এ হোক আমাদের ঐকান্তিক দোয়া। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন!
বিনীত, হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ সম্পাদক, ‘তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন’ অনুবাদ প্রকাশনা প্রকল্প ও চেয়ারম্যান, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন সেপ্টম্বর ২০২৫ |
| পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫৩২
সাইজ: ৬ × ৯.২ ইঞ্চি কভার: হার্ড কভার প্রিন্ট: সাদা কালো কাগজ: ৫৫ গ্রাম অফসেট ওজন: ০.৬ কেজি |
| অর্ডার করার পর সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে ডেলিভারি প্রদান করা হয়।
ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা। (অফিস ডেলিভারি ও হোম ডেলিভারি দু’ব্যবস্থাই রয়েছে) |
| শর্তাবলি:
যদি কোনো পৃষ্ঠা ছেড়া ফাটা থাকে ফর্মা মিসিং হয় কভার উল্টা অথবা ছেড়া হয় এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্সচেঞ্জ দিয়ে থাকি। |



![Shefa O Rahmat [Converted] আল কোরআন: মোমেনদের শেফা ও রহমত](https://alquranacademypublications.com/wp-content/uploads/2026/02/Shefa-O-Rahmat-Converted-300x400.jpg)


Reviews
There are no reviews yet.