কোরআন মাজীদ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ
সূরা ‘আল ক্বামার’ মক্কায় অবতীর্ণ কোরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। আল্লাহ তায়ালা এই সূরায় একটি বিশেষ আয়াত চার বার উল্লেখ করেছেন। সে বিশেষ আয়াতটির অর্থ- অবশ্যই আমি শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, অতএব আছে কি তোমাদের মাঝে কেউ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার?
বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ কোরআন পাঠকের মতো আমার মনকেও এক সময় এই আয়াতটি দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিলো। বিশেষ করে যখন দেখলাম, আল্লাহ তায়ালার নাযিল করা আলোর এই একমাত্র উৎসটির ভাষান্তর করতে গিয়ে মানুষরা একে সহজ করার বদলে অনেক কঠিন ও দুর্বোধ্য করে ফেলেছে। যে ‘আলো’ একজন পথিককে আঁধারে পথ দেখাবে তা যদি নিজেই স্বচ্ছ না হয়, তাহলে পথিক তো আঁধারেই হোঁচট খেতে থাকবে।
কোরআন লওহে মাহফুযের অধিপতি আল্লাহ তায়ালার কালাম। এর ভাষাশৈলী শিল্প সৌন্দর্য সবই আল্লাহ তায়ালার একান্ত নিজস্ব। এ কারণেই বিশ্বের সব কোরআন গবেষকই মনে করেন, এই মহান গ্রন্থের যথার্থ অনুবাদ ও ভাষান্তর কোনোটাই মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। যাঁর কাছে এই বিস্ময়কর গ্রন্থটি নাযিল করা হয়েছিলো তাঁকে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে এই কিতাবের মর্মোদ্ধার করা সম্ভবপর হয়েছিলো। এ কারণেই কোরআন যাদের সর্বপ্রথম সম্বোধন করেছিলো-রসূল (সা.)-এর সে সাহাবীরাও কোরআনের কোনো বক্তব্য অনুধাবনের ব্যাপারে মতামত দেয়ার আগে রসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করে নিতেন। যদিও তারা নিজেরা সে ভাষায়ই কথা বলতেন-যে ভাষায় কোরআন নাযিল হয়েছিলো। সম্ভবত এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামদের বিদায়ের বহুকাল পরও ভিন্ন ভাষাভাষী কোরআনের আলেমরা কোরআনের অনুবাদ কাজে হাত দিতে সাহস করেননি, কিন্তুদিনে দিনে কোরআনের আলো যখন আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে অনারব জনপদে ছড়িয়ে পড়লো, তখন ভিন্ন ভাষাভাষীদের সামনে কোরআনের বক্তব্য তুলে ধরার জন্যে ¯’ানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকলো না। এমনি করেই অসংখ্য আদম সন্তানের অগণিত ভাষায় কোরআন অনুবাদের যে স্রোত ধারা শুরু হলো-আমাদের মায়ের ভাষা বাংলায়ও একদিন এর প্রভাব পড়লো। কোরআনের পণ্ডিত ব্যক্তিরা একে একে এগিয়ে এলেন নিজেদের স্ব-স্ব জ্ঞান গরিমার নির্যাস দিয়ে এই অনুবাদ শিল্পকে সাজিয়ে দিতে।
একথা স্বীকার করতেই হবে, উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাষা হিসেবে আরবীর পরেই ফার্সী ও উর্দূর ¯’ান। স্বাভাবিকভাবেই এখানে কোরআন অনুবাদের কাজও তাই এ দুটো ভাষায়ই বেশী হয়েছে। সুলতানী আমলের শুরু থেকে মুসলমান শাসক নবাবরা যখন সংস্কৃত ভাষার সীমিত গণ্ডি থেকে বাংলা ভাষাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরিমন্ডলে নিয়ে এলেন, তখন থেকেই মূলত এই ভূখণ্ডে কোরআনের বাংলা অনুবাদের ব্যাপক প্রয়োজন অনুভূত হতে লাগলো।
৪৭ ও ৭১ সালের পরপর দুটো পরিবর্তনের ফলে এ ভূখণ্ডের মুসলমানরা নিজেদের ভাষায় কোরআন বুঝার একটা বড়ো পরিসরে পা রাখার সুযোগ পেলো। অল্প কিছুদিনের মাঝেই এখানে কোরআনের বেশ কয়েকটি অনুবাদ বেরুলো। বাংলাদেশের মতো পশ্চিম বংগেও এ সময়ের মধ্যে কোরআনের কয়েকটি অনুবাদ প্রকাশিত হলো। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুবাদক ও প্রকাশকরা তাদের অনুবাদকর্মকে ‘কোরআনের বাংলা অনুবাদ’ না বলে ‘বাংলা কোরআন মাজীদ’ বলে পেশ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কোরআনের বাংলা অনুবাদ গ্রন্থের গায়ে ‘বাংলা কোরআন মাজীদ’ লেখার এই মানসিকতা কিন্তুউভয় বাংলায় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই বিষয়টিকে বাদ দিলে উভয় বাংলায় অনূদিত ও প্রকাশিত কোরআনের প্রতিটি গ্রন্থই নানা বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আল্লাহ তায়ালার কিতাবের মর্মকথা মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজে যে যতোটুকু অবদান রেখেছেন আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সে পরিমাণ ‘জাযায়ে খায়ের’ দান করুন।
কোরআন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর রসূল (সা.)-এর কাছে পাঠানো তাঁর বাণীসমূহের এক অপূর্ব সমাহার। সূদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে যে সব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তার অধিকাংশই বলতে গেলে পারিপার্শ্বিকতা-তথা একেকটি ঐতিহাসিক পটভূমির বিশ্লেষণের সাথে জড়িত। এ কারণেই কোরআনের তাফসীরকাররা কোরআন অধ্যয়নের জন্যে সমসাময়িক পরিস্থিতি জানার ওপর এতো বেশী জোর দেন।
তারপরও কোরআনের মূল অনুবাদ কিন্তুসমসাময়িক কোরআন পাঠকদের কাছে জটিলই থেকে যায়। অনেক সময় মূল কোরআনের আয়াতের হুবহু বাংলা অনুবাদ করলে কোরআনের বক্তব্য পরিস্কার হয় না। সে ক্ষেত্রে কোরআনের একজন নিষ্ঠাবান অনুবাদককে অনুবাদের সাথে ভেতরের উহ্য কথাটি জুড়ে দিয়ে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দিতে হয়। আরবী ভাষার ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন প্রক্রিয়ায় এগুলোর প্রচলন থাকলেও বাংলাভাষায় এ বিষয়গুলো কোরআনের পাঠককে মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলে। তারা হেদায়াতের এই মহান গ্রন্থে ভাবের অসংলগ্নতা দেখে বর্ণনাধারার ‘মিসিং লিংক’ খোঁজার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ কারণেই সচেতন অনুবাদকরা এ সব ক্ষেত্রে ব্যাখ্যামূলক কথার জন্যে ‘ব্রাকেট’ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ধরনের টাইপ ব্যবহার করে সেই মিসিং লিংকটাকে মিলিয়ে দেন। আমাদের মধ্যে যারা ‘তাফসীরে জালালাইন’ পড়েছেন তারা সেখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করে থাকবেন। এই তাফসীরে উভয় তাফসীরকার তাদের ব্যাখ্যামূলক কথাকে ‘আন্ডার লাইন’ করে আল্লাহ তায়ালার কথা থেকে আলাদা করে নিয়েছেন। কোরআনে এ ধরনের আয়াতের সংখ্যা অনেক। এখানে উদাহরণ হিসেবে সূরা আল মায়েদা ৬, সূরা ইউসুফ ১৯, সূরা আর রাদ ৩১, সূরা আঝ ঝুমার ২২, সূরা ক্বাফ ৩-এর কয়েকটি আয়াতের প্রসংগ উল্লেখ করা যেতে পারে। এ আয়াতগুলোর অনুবাদের প্রতি তাকালে একজন পাঠক নিজেই এ বিষয়টি বুঝতে পারবেন, কি ধরনের ধারাবাহিকতার কথা আমি এখানে বলতে চেয়েছি। আমাদের এই গ্রন্থে অনুবাদের সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যে আমি আল্লাহ তায়ালার মূল কথা থেকে ব্যাখ্যামূলক কথাকে আলাদা করার জন্যে এ ধরনের () ‘ব্রাকেট’ ব্যবহার করেছি। কোরআনের মালিককে হাযির নাযির জেনে আমরা যেমন চেষ্টা করেছি ব্রাকেটের ভেতর আল্লাহ তায়ালার কথা না ঢুকাতে-তেমনি চেষ্টা করেছি ব্যাখ্যামূলক কথাগুলো কোনো অবস্থায়ই ব্রাকেটের বাইরে না ছড়াতে। তারপরও যদি কোথাও তেমন কিছু ভুল ক্রটি থেকে যায় তা আগামীতে শুদ্ধ করে নেয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞার পাশাপাশি আমার মালিককে বিনীত চিত্তে বলবো, হে আল্লাহ, আমার নিষ্ঠার প্রতি দয়া দেখিয়ে তুমি আমার সীমাবদ্ধতা ক্ষমা করে দিয়ো।
কিশোর বয়স থেকেই যখন আমি কোরআনের সাথে পথচলা শুরু করেছি-আমি কোরআনের একটা সহজ অনুবাদের স্বপ্ন দেখতে থাকি। আমিও অনেকের মতো চিন্তা করতাম, আল্লাহ তায়ালা নিজে যেখানে বলেছেন-‘আমি কোরআনকে সহজ করে নাযিল করেছি’ সেখানে আমরা কেন কোরআনের অনুবাদটা সহজ সরল করার বদলে দিনে দিনে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছি। বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের অনুবাদ দেখে অনেকের মতো আমিও বহুবার নিরাশ হয়েছি। মনে হয়েছে আরবী কোরআনের চাইতেও বুঝি এর বাংলা অনুবাদ বেশী কঠিন। এমনটি বহু বার ঘটেছে যে, অনূদিত অংশটি বার বার পড়েও একজন পাঠক বুঝতে পারেননি, আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে আসলে কী বলতে চেয়েছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন, তিনি এই কোরআনকে সহজ করে নাযিল করেছেন।
আমার মালিক আল্লাহ তায়ালার হাজার শোকর তিনি আমার জন্যে আমার মনের কোণে লালিত দীর্ঘদিনের সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটা সুন্দর সুযোগ এনে দিলেন। ১৯৯৫ সালের দিকে আমি যখন বিশ্ববরেণ্য একটি তাফসীরের বাংলা অনুবাদ প্রকাশনার কাজ শুরু করলাম, তখন আমি কোরআনকে আমার নিজের করে বুঝবার ও বুঝাবার মাধ্যমে সে সুযোগটাই যেন পেয়ে গেলাম। সেই আরবী তাফসীরের বাংলা অনুবাদ গ্রন্থে ব্যবহারের জন্যে আমাদের তখন একটি সহজবোধ্য বাংলা অনুবাদের প্রয়োজন ছিলো। বহুদিন পর কোরআন যেন নিজেই আমাকে হাতছানি দিয়ে নিজের দিকে ডাক দিলো। এমনি একটা ডাকের জন্যে আমি যে কিভাবে অধীর আগ্রহে দীর্ঘদিন ঘরে অপেক্ষা করছিলাম-তা শুধু আমার মালিকই দেখেছেন।
এটা আমার প্রতি আমার মালিকের একান্ত দয়া যে, তিনি সে মহান তাফসীরের হাজার হাজার পৃষ্ঠার বিশাল পরিমন্ডলে আমার জন্যেও একটুখানি জায়গা করে দিলেন! ১৯৯৫ সালে এই তাফসীরের আমপারার অনুবাদ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন থেকে এই তাফসীরকে যারা ভালোবেসেছেন তারা এই অধমের কোরআনের অনুবাদকেও তাদের ভালোবাসা দিয়েছেন। আমি একান্ত আগ্রহের সাথেই এই নতুন ধারার অনুবাদটির ব্যাপারে দেশের ওলামায়ে কেরাম ও সুধী বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিলাম। আলহামদু লিল্লাহ! একটি যুগোপযোগী আধুনিক তাফসীর হিসেবে সে তাফসীরটিকে যেমন এখানকার সর্বস্তরের মানুষরা ভালোবেসেছেন, তেমনি এই তাফসীরে ব্যবহৃত অধমের কোরআনের এই অনুবাদকেও তারা ভালোবাসা দিয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, তারা এই প্রথম কোরআনের এমন একটি অনুবাদ হাতে পেয়েছেন যা কোনোরকম ব্যাখ্যা বা টীকার আশ্রয় ছাড়াই তাদের কোরআনের বক্তব্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
আসলে এ হচ্ছে কোরআনের মালিকের সাথে কোরআনের একজন নিবেদিত প্রেমিকের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়। এ পরিবেশের সাথে শুধু সে ব্যক্তিই পরিচিত হতে পেরেছে যে নিজের জীবনটাকে কোরআনের ছায়াতলে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোরআনের এই অনুবাদ করার সময় আমি বহুবারই এমন কিছু অনুভব করেছি। কোনো আয়াতের সামনে তার বক্তব্য অনুধাবনের জন্যে আমি ¯’বির হয়ে দাঁড়িয়েছি, নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও ভাষাজ্ঞান যখন আর আমাকে সাহায্য করতে পারছিলো না, তখনি দেখেছি কে যেন আমাকে দূরে থেকে সে কাংখিত ব¯‘টি দেখিয়ে দিচ্ছে।
আলহামদু লিল্লাহ, আজ আমি একান্ত নিবিষ্ট চিত্তে একথাটা বলতে পারছি যে, কোরআনের এই অনুবাদকর্মটি যেমনি আমার দিবস রজনীর পরিশ্রম, তেমনি তা আল্লাহর গায়বী মদদনিসৃত নিষ্ঠারই বর্হিপ্রকাশ। তারপরও আমার অনুবাদে ভুল থাকবে না এমন কথা বলার ঔদ্ধত্য আমি কখনোই দেখাবো না। সে ধরনের ভুলের দিকে আমি নিজে যেমন তীক্ষ্ম নযর রাখছি তেমনি সুধী পাঠকদের- বিশেষ করে সম্মানিত ওলামায়ে কেরামদেরও আমি এর প্রতি তীক্ষ্মনযর দিতে অনুরোধ করবো। যখনি এ ধরনের কোনো ভুলক্রটি কারো কাছে ধরা পড়বে এবং আমরাও তা জানতে পারবো-ইনশাআল্লাহ সাথে সাথেই আমরা তা সংশোধনের চেষ্টা করবো। এ সংশোধন প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্যে আমরা আমাদের লন্ডন ও ঢাকা অফিসে ২ টি স্বতন্ত্র রেজিষ্টার সংরক্ষণ করি। এ ধরনের কোনো সংশোধনী এলে তা সাথে সাথে আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করি এবং গঠনমূলক পরামর্শ হলে পরবর্তী সংস্করণেই তা সংশোধন করে দেই।
আল্লাহ তায়ালার রহমতে এই বিশাল তাফসীরের প্রকাশনা সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে আমার কোরআনের অনুবাদের কাজও শেষ হয়ে গেছে। দেশে-বিদেশে সে তাফসীরের অসংখ্য পাঠক শুভানুধ্যায়ীরা আমাদের অনুরোধ করেছেন, আমরা যেন কোরআনের এই অনুবাদকে আলাদা প্রকাশ করি। তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েই আমরা ‘কোরআন মাজীদ ঃ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ’গ্রন্থটি প্রকাশ করেছি। ঢাকায় আয়োজিত বাংলাদেশের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী সভার কয়েকজন সিনিয়র সদস্য, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশ্ব বরেণ্য ওলামায়ে কেরামদের মহতি সম্মেলনে এই গ্রন্থটির উদ্বোধন করা হয়।
কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে কোরআনের শুধু অনুবাদ অংশটিকে আলাদা পুস্তকাকারে প্রকাশেরও অনুরোধ জানিয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাথে আমরা বিষয়টি নিয়ে অনেকবার কথা বলেছি। কোরআনের শুধু অনুবাদগ্রন্থপ্রকাশে কিছু উদ্বেগ কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা ‘আরবী মতন’ ছাড়া ‘কোরআনের সহজ সরল বাংলা অনুবাদ’ বইটি প্রকাশ করেছি। নীতিগতভাবে আমি কোরআনের এ ধরণের অনুবাদগ্রন্থপ্রকাশের বিরোধী, এটা আমার আপনজনরা ভালো করেই জানেন। এর আগেও আমি বিভিন্নভাবে এ কথাটা বলেছি যে, আল্লাহর কিতাবের মৌলিক ভাষা হচ্ছে আরবী। আরবী ভাষায়ই এই কিতাব নাযিল হয়েছে; সুতরাং ‘আরবী মতন’ ছাড়া কোরআন মাজীদের কল্পনা অসম্ভব।
অবশ্য পৃথিবীর প্রায় সব কয়টি ভাষাতেই এখন কোরআনে হাকীমের শুধু অনুবাদগ্রন্থপ্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজী ভাষার প্রাচীন অনুবাদ জর্জ সেল-এর গ্রন্থ (ফ্রেডারিক ওয়ার্ণ এন্ড কোং, নিউইয়র্ক, প্রকাশকাল ১৭৩৪), জে এম রডওয়েল (এভরিম্যান্স লাইব্রেরী, প্রকাশকাল ১৯০৯), এন জে দাউদ (প্যাংগুইন ক্লাসিক, প্রকাশকাল ১৯৫৬), আর্থার জে আরবেরী (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রকাশকাল ১৯৬৪) সহ অসংখ্য অনুবাদ গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা যায়। উর্দু ও ফার্সী ভাষায় এ ধরনের অনুবাদ গ্রন্থের পরিমাণ তো আরো অনেক বেশী। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থের নাম হচ্ছে মাওলানা ফতেহ মোহাম্মদ খান জলন্দরীর ‘নূরে হেদায়াত’। এই গ্রন্থে ব্যবহৃত অনুবাদই প্রতিদিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। বাংলাভাষায় কোরআনের যেসব অনুবাদ কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছে তার পরিমাণও এখন কম নয়। মাওলানা মোবারক করীম জওহর-এর অনুবাদ এর মধ্যে অন্যতম (হরফ প্রকাশনী, প্রকাশকাল ১৯৭৪)। ঢাকায়ও ইতিমধ্যে কোরআনের এ ধরনের কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থপ্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্বের এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা ৩৪ কোটি বাংগালীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অমুসলিম বিধায় তাদের হাতে দেয়ার জন্যে এমনিই আমাদের কোরআনের শুধু বাংলা অনুবাদগ্রন্থপ্রয়োজন। এটি আল কোরআন একাডেমী লন্ডনের বিনামূল্যে কোরআন বিতরণ কর্মসূচীতে একটি নতুন সংযোজন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ প্রয়াসকে কবুল করুন।
বর্তমান নিবন্ধে একথাটি আমি পাঠকদের বিশেষভাবে স্মরণ করাতে চাই যে, কোরআনের কোনো অনুবাদ গ্রন্থকিন্তু‘কোরআন’ নয়-এটা হচ্ছে কোরআনের বাংলা অনুবাদ মাত্র। সুতরাং যারা এই গ্রন্থপড়বেন তারা মেহেরবানী করে সর্বদাই মূল আরবী কোরআন পাশে রেখেই পড়বেন, আর বলার অপেক্ষা রাখে না-আমরা সেই প্রয়োজনেই একে আলাদা প্রকাশ করেছি। আমার উদ্বেগ ও সীমাবদ্ধতার কথা আমি কোরআনের আপনজনদের বলতে পেরেছি-এটাই আমার সান্ত্বনা।
আলহামদু লিল্লাহ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন পেশা ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমরা আরো অনেক ধরনের কোরআনের অনুবাদ গ্রন্থপ্রকাশ করেছি। ইতিমধ্যেই আমরা আল কোরআন একাডেমী লন্ডনের সাহসী প্রকল্প কোরআন ডিস্ট্রিবিউশান ওয়ার্ল্ডওয়াইডের আওতায় স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয়, আরাকান ও প্রবাসে বসবাসরত ১ কোটিসহ বিশ্বের প্রায় ৩৪ কোটি শিক্ষিত বাঙ্গালীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্যে সম্পূর্ণ আলাদা করে কোরআনের একটি অনুবাদগ্রন্থপ্রকাশ করেছি।
যাদের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা আমাকে কোরআনের সাধনা ও কোরআনকেন্দ্রিক জীবন গঠনে দিবানিশি প্রেরণা দিয়েছে, তারা হলেন আমার মহান আব্বা মরহুম মাওলানা মানসূর আহমদ ও জান্নাতবাসিনী মা জামিলা খাতুন। আজ তারা কেউ তাদের সন্তানের এ খেদমতটুকু দেখার জন্যে দুনিয়ায় জীবিত নেই, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অপার করুণা দিয়ে তাদের উভয়কে জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান করে দিন।
আমার স্ত্রী, খ্যাতিমান লেখিকা খাদিজা আখতার রেজায়ী-যে মহীয়সী নারী তার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা কোরআনের জন্যে উজাড় করে দিয়েছেন তার কথা বাদ দিয়ে কোরআনের এই অনুবাদ গ্রন্থেরভূমিকা লিখবো কি করে? বলতে দ্বিধা নেই, তিনি পাশে আছেন বলেই আল্লাহর নামে মাঝে মাঝে ছেঁড়া পালেও আমি সাগর পাড়ি দেয়ার সাহস করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের যাবতীয় অপূর্ণতাকে তাঁর দয়া ও মাগফেরাত দিয়ে পূর্ণ করে দিন।
আল কোরআন একাডেমী লন্ডন কোরআনের যে পরিবর্ধিত ও পরিশীলিত সংস্করনটি আজ আপনার হাতে তুলে দি”েছ, তা মূলত সাধারণ পাঠকদের মাঝে আমাদের কোরআন মাজীদকে আরো বেশি সুন্দর করার অব্যাহত প্রচেষ্টারই অংশ। আমি আশাকরি, এই নতুন সংস্করণে আরবী ও বাংলা ফণ্টে গ্যাপ বাড়িয়ে দেয়ার কারণে কোরআনের এই কপিটি আরো বেশী পাঠকবান্ধব হবে। আল্লাহ তায়ালা এই পাঠকবান্ধব কোরআনকে কেয়ামতের দিন আমাদের সকলের জন্যে শাফায়াতবান্ধব বানিয়ে দিন।
‘আল কোরআন একাডেমী’-এর ঢাকা ও লন্ডন কার্যালয়ের কম্পোজ, ডিজাইন, প্রুফ, প্রেস ও বাইন্ডিং বিভাগে নিয়োজিত আমার সহকর্মীরা দিবারাত্রি পরিশ্রম করে এই বরকতময় পুস্তকের প্রকাশনা ত্বরান্বিত করেছেন, এর সাথে কলকাতাসহ পৃথিবীর অন্যান্য শহরে যারা এ গ্রন্থের বিতরণ ও বিপণনে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন-আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। এ ছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারা দেশ বিদেশে আমাদের এই মহান কাজে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন প্রেরণা দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা তাদের সবার সাথে আমাদেরও জান্নাতের ফুল বাগিচায় একই সামিয়ানার নীচে সমবেত করুন। আমীন!!
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ
চেয়ারম্যান, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন
সফর ১৪৪৭, শ্রাবণ ১৪৩২, আগষ্ট ২০২৫
লন্ডন
| প্রোডাক্ট স্পেসিফিকেশন:
|
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৮২৪
সাইজ: ৭ × ৯.২ ইঞ্চি কভার: হার্ড কভার প্রিন্ট: সাদা কালো কাগজ: ৫৫ গ্রাম অফ হোয়াইট ওজন: ১.৩ কেজি |
| ডেলিভারি তথ্য: | অর্ডার করার পর সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে ডেলিভারি প্রদান করা হয়।
ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা। (অফিস ডেলিভারি ও হোম ডেলিভারি দু’ব্যবস্থাই রয়েছে) |
| রিটার্ন পলিসি | শর্তাবলি:
যদি কোনো পৃষ্ঠা ছেড়া ফাটা থাকে ফর্মা মিসিং হয় কভার উল্টা অথবা ছেড়া হয় এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্সচেঞ্জ দিয়ে থাকি। |
নির্ধারিত কোরআন মাজীদগুলো ব্যতীত অন্যান্য বইয়ে ৪০% ছাড়







Reviews
There are no reviews yet.